কলকাতা: পশ্চিমবঙ্গ শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি কাণ্ডে রাজ্য সরকারের ভূমিকাকে এক তীব্র প্রহসন বলে অভিহিত করে সমালোচনার ঝড় তুলেছে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্ক্সবাদী) বা সিপিআইএম। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে প্রায় ২৬ হাজার শিক্ষক ও অশিক্ষক কর্মীর চাকরি বাতিলের পর, স্কুল সার্ভিস কমিশন (এসএসসি) কর্তৃক মাত্র ১৮০৪ জনকে 'কলঙ্কিত' হিসেবে চিহ্নিত করাকে দুর্নীতির আসল তথ্য ধামাচাপা দেওয়ার একটি মরিয়া চেষ্টা হিসেবে দেখছে বাম শিবির। তাদের মূল প্রশ্ন, যদি মাত্র ১৮০৪ জন দুর্নীতিগ্রস্ত হন, তাহলে বাকি ২৪ হাজারের বেশি চাকরিহারাদের ভবিষ্যৎ নষ্টের দায় কার?
২০১৬ সালের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগে প্রথমে কলকাতা হাইকোর্ট এবং পরে সুপ্রিম কোর্ট সম্পূর্ণ প্যানেলটিই বাতিল করে দেয়। এই রায়কে কেন্দ্র করে রাজ্য সরকারের প্রতিটি পদক্ষেপকে 'নাটক' বলে কটাক্ষ করেছে সিপিআইএম। দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সুজন চক্রবর্তী রাজ্য সরকারের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, "বার বার প্রশ্ন তোলা হয়েছে, এসএসসি-র ফল কেন ওয়েবসাইটে প্রকাশ হচ্ছে না, কেন চালে কাঁকর মেশানো হচ্ছে? সরকার চুপ থেকেছে।" তাঁর অভিযোগ, "টাকার বিনিময়ে যাঁরা চাকরি পেয়েছেন, তাঁদের পাশে সরকার কেন? সরকার আসলে দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দিয়েছে। এখনও সরকার এমন ব্যবস্থা চালাচ্ছে যাতে আবার অযোগ্যদের ঢুকিয়ে দিয়ে পুরো প্রক্রিয়াটাকে বিষিয়ে দেওয়া যায়।"
সিপিআইএমের মতে, ২৬ হাজার চাকরি বাতিলের পর মাত্র ১৮০৪ জনের 'কলঙ্কিত' তালিকা প্রকাশ করাটা হাস্যকর এবং মূল দোষীদের আড়াল করার একটি চক্রান্ত। এই প্রসঙ্গে দলের রাজ্যসভার সাংসদ এবং এই মামলার অন্যতম আইনজীবী বিকাশ রঞ্জন ভট্টাচার্য স্পষ্ট জানিয়েছেন, যখন একটি নিয়োগ প্রক্রিয়া গোড়া থেকেই দুর্নীতিগ্রস্ত হয়, তখন যোগ্য এবং অযোগ্যকে আলাদা করা অসম্ভব।]তিনি বলেন, "গোটা নিয়োগ প্রক্রিয়াটাই দুর্নীতিগ্রস্ত। প্রক্রিয়া যখন জন্ম থেকেই দুর্নীতিগ্রস্ত হয়, তাতে যোগ্য-অযোগ্য আলাদা করা যায় না।" অর্থাৎ, তৃণমূল সরকারের সৃষ্ট দুর্নীতির কারণেই আজ হাজার হাজার যোগ্য প্রার্থীকেও তাঁদের চাকরি হারাতে হয়েছে, এবং এর সম্পূর্ণ দায় সরকারের।
বিকাশ রঞ্জন ভট্টাচার্য আরও মনে করেন যে, 'কলঙ্কিত'দের তালিকা প্রকাশ হলেই আসল কেলেঙ্কারি সামনে আসবে।বামেদের অভিযোগ, তৃণমূল সরকার নিজেদের ঘনিষ্ঠ এবং দলের সেইসব নেতা-মন্ত্রীদের বাঁচাতে চাইছে, যাদের অঙ্গুলিহেলনে এই বিপুল দুর্নীতি সম্ভব হয়েছে।
রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রায় ১৭ হাজার চাকরিহারাকে স্টাইপেন্ড দেওয়ার ঘোষণাকেও তীব্রভাবে সমালোচনা করেছে সিপিআইএম। তাদের প্রশ্ন, কোন যুক্তিতে ২৬ হাজার জনের মধ্যে থেকে ১৭ হাজার জনকে বেছে নেওয়া হলো? বাকিদের কী হবে? সিপিআইএমের মতে, এই পদক্ষেপ আসলে ভোটব্যাঙ্কের রাজনীতি ছাড়া আর কিছুই নয়। এটি দুর্নীতির দায় থেকে মুখ ফিরিয়ে সহানুভূতি আদায়ের একটি কৌশল।
বাম শিবিরের নেতৃত্ব মনে করে, এই দুর্নীতি কেবল কিছু ব্যক্তির বিচ্ছিন্ন অনিয়ম নয়, বরং এটি তৃণমূল সরকারের গভীরে ছড়িয়ে থাকা এক প্রাতিষ্ঠানিক কেলেঙ্কারি। এর ফলে রাজ্যের শিক্ষাব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে এবং হাজার হাজার তরুণের ভবিষ্যৎ অন্ধকারে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। সিপিআইএমের দাবি, শুধুমাত্র কিছু 'চুনোপুঁটি'কে 'কলঙ্কিত' তকমা দিয়ে আসল 'রাঘববোয়াল'দের বাঁচানোর এই সরকারি প্রহসন রাজ্যের মানুষ ধরে ফেলেছে এবং এর জবাব তারা দেবে। তাঁদের মতে, বাকি ২৪ হাজার চাকরিহারা আসলে তৃণমূল সরকারের দুর্নীতির শিকার, এবং এর দায় নিয়ে অবিলম্বে মুখ্যমন্ত্রীর পদত্যাগ করা উচিত।