মে দিবস ও অঙ্গীকার
(শংকর পাল)
প্রতিবছর মে দিবস পালন হয়ে থাকে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে।অবশ্য এই দিনটি একান্ত ভাবেই শ্রমজীবী শ্রেণীদের সংগ্রামের বিজয় দিবস। ১৮৮৬ খ্রিস্টাব্দে আমেরিকার শিকাগো শহরের হে মার্কেটে শহিদদের আত্মত্যাগকে স্মরণ করে পালিত হয়। সেদিন দৈনিক আটঘণ্টার কাজের দাবিতে শ্রমিকরা হে মার্কেটে জমায়েত হয়েছিল। তাদেরকে ঘিরে থাকা পুলিশের প্রতি এক অজ্ঞাতনামার বোমা নিক্ষেপের পর পুলিশ শ্রমিকদের ওপর গুলিবর্ষণ শুরু করে। ফলে প্রায় ১০-১২ জন শ্রমিক।পেরিয়ে গেছে কয়েক দশক তবুও শ্রমিক শোষণ বন্ধ হয় নি উল্টে প্রতিদিন নানা কৌশলে তা নামিয়ে আনা হচ্ছে শ্রমিক শ্রেণীর উপর।শোষণ মুক্তির কিছুটা অনুভব সোভিয়েত দেশে করা গেছে,তারপর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পূর্ব ইউরোপের বহু দেশেই শ্রমিক শ্রেণীর সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়।
সেই ব্যবস্থা দেখে অনুপ্রাণিত হওয়া শ্রমিক স্বপ্ন দেখতে শুরু করে ছিলো বিভিন্ন দেশে।আমাদের দেশ ও বাদ যায় নি।স্বাধীনতার পর থেকে কংগ্রেসের ঘোষিত নীতি কিছুটা সমাজতান্ত্রিক বোধের পরিচয় দেখা যায়।যদিও বার বার কংগ্রেসের কর্পোরেট দের প্রতি আপোষ নীতি শ্রমিক শোষণ বন্ধ হয় নি ।অবশেষে ৯০ এর দশকে এসে কংগ্রেসের বিষ দন্ত বিকশিত হয়ে পড়ে।সোভিয়েত এর পতনের পরেই শুরু হয় গোটা বিশ্বে ডলারের আগ্রাসন।উরুগুয়ের মারাকাসে ভারতের তৎকালীন কংগ্রেসের সরকার তাদের ঘোষিত নীতি শুধু বদল করে না এক প্রকার দেশীয় পুঁজির বিকাশ কে ধ্বংস করার ঘোষণা করে।অবাধ বিদেশি পুঁজির অনুপ্রবেশ যা বহু দেশীয় সংস্থার মালিকানা বদল হয়ে যায় কিংবা বন্ধ হয়ে যায়।সুস্থ্য প্রতিযোগিতার কথা বলে বিদেশি পুঁজি গ্রাস করে দেশীয় শিল্পগুলিকে।শুরু ব্যাপক ছাটাই,শোষণের বিজয় রথ।শুরু হয় নতুন ধরনের শোষণ স্পেশাল ইকোনোমিক জোন তৈরি হয় দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যেখানে বৃহৎ পুঁজির ব্যবসা করার সাথে সাথে শ্রমিক দের অধিকার সুরক্ষিত আইন লাগু হবে না।যা সেদিন তৈরি হয়েছিল ধাপে ধাপে অর্জিত শ্রমিকের অধিকারের উপর আঘাত।
বামপন্থীদের লাগাতার আন্দোলন কটাক্ষের মুখে পড়ে তাদের দাগিয়ে দেওয়া হয় সময়ের সাথে চলতে না পারা একটি প্রাচীন ধ্যান ধারণার পার্টি।নব্বইয়ের দশকে পেরিয়ে অনেকটা সময় অতিবাহিত বিদেশি পুঁজি পরিণত এখন নয়া উদারবাদী ভূমিকায়।এর মধ্যেই গোটা বিশ্বে লড়াই আমরা মনে ভুলেই গেছি ব্রাসেলসে প্রথম শহীদ কার্লো গুইলানী এর কথা যার সোচ্চার স্লোগান থেমে গেছিলো পুলিশের বুলেটে। সময় এখন অনেকটাই অতিবাহিত এর মধ্যে দেশের সংসদে পাস হয়েছে কারখানা বিক্রির আইন পাশ হয়েছে শ্রমিক অধিকার বিরোধ আইন।সুকৌশলে রাজনৈতিক সংখ্যা গরিষ্টতার দোহাই দিয়ে একের পর এক আইন।বিজেপি এর উত্থান ধর্মীয় মেরুকরণে হলেও পরবর্তীকালে কংগ্রেসের দেখানো নীতির নির্মম ভাবে পালনের চিত্রপট দেখছে গোটা দেশ।নতুন ভাবে শ্রমিক দের সংজ্ঞা তৈরির চেষ্টা ,কাজের নিরাপত্তা হ্রাস,চুক্তিভিত্তিক শ্রমিক নিয়োগ যথেচ্ছ ভাবে লাগু করছে এই সরকার।নব সংযোজন শ্রম কোড যার মাধ্যমে শ্রমিক তার শ্রম বিক্রির অধিকার হারাবে।
শুধু উৎপাদনের প্রয়োজনীয়তার নিরিখে শ্রমিক কাজের লাইনে থাকবে অর্থাৎ নিরাপত্তা ও কাজের সময় সবটাই ভেঙে পড়বে।বিগত বেশ কয়েক বছর সিআইটিইউ ব্যাপক কর্মসূচি শুধুমাত্র শ্রমিক সংগঠনের ঐক্য যা অনেক ক্ষেত্রেই সফল হলেও , বাম শ্রমিক সংগঠনের বিস্তার ক্ষতিগ্রস্ত হয়।তবুও বাম শ্রমিক সংগঠন বার বার রাস্তায় নেমেছে বিপদ বোঝাতে, ধর্মঘটে নেমেছে।সবকিছুর পরেও যে ঐক্যে গড়ার ডাক ছিল তার নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছানো যায় নি।আবার একটা মে দিবস অঙ্গীকার তাই থাকবে পুরোনো শোষণের কৌশল বদলানোর সাথে শ্রমিকদের সংগ্রামের বিভিন্ন পথ ও উন্মোচিত।আগামী মে দিবস যেন লড়াইয়ের বিজয় গাঁথা সেই প্রতিজ্ঞা থাকুক কারখানার গেটে শ্রমিক মহল্লায়।
*"মে দিবস দিচ্ছে ডাক শোষণের পুঁজিবাদ নিপাত যাক "*


