ফিরে দেখা---মে-দিবস
-------------------------------------------------
শ্রী বিকাশ কুমার রায়।
1886সালের পয়লা মে, চিকাগোর হে-মার্কেটে রক্তে রাঙা হ'ল খোলা রাজপথ---প্রথম শহীদ হ'ল মজুর---
লাল সেলাম, লাল সেলাম---রক্তে ধোয়া মে তোমায় সেলাম---- কলেজে, কৈশোর-যৌবনের সন্ধিক্ষণে এই গানটা সেইসময় শরীরের লোম খাড়া করে দিত---ভাষা দিয়ে ব্যখ্যা করতে পারব না কিন্তু গানটা শোনা মাত্রই কানের ভেতর দিয়ে মরমে প্রবেশ করে কেমন যেন একটা মাদকতা সৃষ্টি করতো।
সেই মাদকতার টানেই একদিন ছাত্র ফেডারেশন সদস্য হলাম।মার্কস, লেলিনের বই পড়তে শুরু করলাম।আমার রসায়নের বই তখন তাকের বুক-সেল্ফে তোলা থাকতো।কোনোদিনই খুব হিসেবি মানুষ ছিলাম না---ফলে চলতি হাওয়ায় মেতে উঠতে সময় লাগল না।যতটা প্রতিশ্রুতি ছিল---সেইভাবে কেরিয়ার গড়তে পারলাম না।তারজন্য অবশ্য কোনোদিনই আপশোশ করিনি।হ্যঁ, পৌঢ়ত্বের কিনারে এসে আজও করি না।আসলে আমি কোনোদিনই আকাশ ছুঁতে চাই নি বরং মাটিতে পা রেখে আকাশের রামধনু দেখতে চেয়েছি।তবে এটাও ঠিক প্রথম যৌবনে বে-হিসেবের জন্য যে সব অমূল্য রত্ন পেয়েছি---সেটাও খুব কম পাওনা নয়।সেইসময় জীবনে উমঙ্গ ছিল, তরঙ্গও ছিল----জীবনটা এইরকম কাটি পতঙ্গ ছিল না।
তবুও আজ মে-দিবসের নূতন সকালে একবার ফিরে দেখতে ইচ্ছে করছে সার্ধ শতবর্ষের মাইল ফলকের দিকে এগিয়ে চলা শ্রমিক দিবসকে।শ্রমিকরা কি তাঁদের সঠিক মর্যাদা ও অধিকার পেয়েছে?না, না--এয়ার-কন্ডিশন ঘরে বসে থাকা সরকারি আধিকারিক, মেট্রো পলিটন শহরের পালিশ করা ইংলিশ মিডিয়ামে পড়া তথ্য-প্রযুক্তির কর্মচারী কিম্বা ইঞ্জিনিয়ার-ডাক্তার-মাস্টার-অধ্যাপকদের কথা বলছি না।কেমন আছেন দিন-আনা-দিন-খাওয়া শ্রমিকরা?বীরভূমের পাঁচামীতে যাঁরা পাথর ভাঙে, কাঠফাটা রোদে যাঁরা নদী থেকে বালি ভরে, যাঁরা একশ দিনের কাজ করে?কেমন আছেন রিক্সাওয়ালা, টোটোওয়ালা কিম্বা বাবু বাড়িতে কাজ করা কাজের মেয়েরা?তাঁরা কি মে-দিবসের আট ঘন্টার কাজের দাবীর কথা জানেন?তাঁদের শিক্ষা-স্বাস্থ্য আর জীবন যাত্রার মান এই দেশে বা আমাদের সোনার বাংলায় কতটা উন্নত হয়েছে? সঠিক উত্তর হ'ল---না।বন্ধুবর দেবা সঠিক ভাবেই বলেছে---শাসক পাল্টায় কিন্তু শোষণ পাল্টায় না।মালিক পাল্টায় কিন্তু দাসত্ব পাল্টায় না।
দরিদ্র মানুষ----শ্রীকৃষ্ণের অষ্টোত্তর শতনামের নামের রাজনৈতিক নেতারা এদের বিভিন্ন নামে ডাকেন---কেউ বলেন সর্বহারা, কেউ বলেন মা-মাটি-মানুষ কেউবা আবার আদর করে বলেন 'মেরে প্যারে দলিত ভাই'।শ্রমিক দিবসের 135 বছর পরেও তাঁদের জন্য আছে শুধু শ্লোগান, মিছিল আর জ্বালাময়ী বক্তৃতা।আর আছে ভাঙা প্রতিশ্রুতির বিসন্ন প্রাঙ্গনে শূন্য অঙ্কের খেলা।রাজনৈতিক দলের রঙ পাল্টে লাল থেকে সবুজ, সবুজ থেকে নীল-সাদা কিম্বা ভবিষ্যতে হয়তো গেরুয়াও হতে পারে----কিন্তু শূণ্যের সাথে শূণ্য যোগ্য করলে বা গুন করলে শূন্যই পাওয়া যাবে।রঙ পাল্টে অঙ্ক শাস্ত্র পাল্টানো যায় না।
স্বপ্ন তো সবাই দেখায় কিন্তু সত্যি কথা হ'ল এদের ধূসর জীবনে রঙের বর্ণমালা কিন্তু আজও ফোটে নি।বিপ্লব কিম্বা সমাজতন্ত্রের স্বপ্ন দেখানো শাসকরা সাড়ে তিন দশকেও পারে নি----তবে এটা নিশ্চিত এইভাবে চললে ছেঁড়া মলাটের সভ্যতার আলো হয়তো আবার ফিরে যাবে----লম্ফ জ্বলা ঘরে।


