দুর্গাপুর: সত্তরের দশকের সেই অন্ধকার সময়, যখন বাংলার বুকে আধা-ফ্যাসিস্ট সন্ত্রাসের কালো ছায়া নেমে এসেছিল, তখন গণতন্ত্রের পতাকা উড্ডীন রাখতে প্রাণ দিয়েছিলেন দুর্গাপুরের হিন্দুস্তান স্টিল এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের অগ্রণী সৈনিক কমরেড ষড়ানন মুখার্জি। তৎকালীন কংগ্রেসের দুষ্কৃতীদের হাতে নির্মমভাবে খুন হয়েছিলেন তিনি, শুধু তিনি একা নন, সেই সময় দুর্গাপুরের মাটিতে ৩০ জন কমরেড শহীদ হয়েছিলেন গণতন্ত্র রক্ষার এই সংগ্রামে। তাঁদের সেই আত্মত্যাগের ৫৪তম বার্ষিকীতে দুর্গাপুর ইস্পাত অঞ্চলের তানসেন মোড়ে স্ফুলিঙ্গ সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর আহ্বানে পালিত হলো এক আবেগঘন শহীদ দিবস।
এই স্মরণ সভা ছিল শুধু একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং শ্রমজীবী মানুষের হৃদয়ের গভীর থেকে উঠে আসা এক অশ্রুসিক্ত শ্রদ্ধাঞ্জলি। কমরেড ষড়ানন মুখার্জির আদর্শ, তাঁর স্বপ্ন, তাঁর লড়াইয়ের স্মৃতি আজও দুর্গাপুরের মানুষের মনে জ্বলজ্বল করে। তিনি ছিলেন একজন শ্রমিক, একজন সাংস্কৃতিক কর্মী, এবং গণতন্ত্রের এক অতন্দ্র প্রহরী। তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে তানসেন মোড়ে জড়ো হয়েছিলেন শত শত মানুষ—শ্রমিক, সাংস্কৃতিক কর্মী, গণতান্ত্রিক আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ এবং সাধারণ মানুষ, যাঁদের হৃদয়ে এখনও জ্বলে সরননের সেই অগ্নিস্ফুলিঙ্গ।সভায় সভাপতিত্ব করেন স্ফুলিঙ্গ সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে প্রকাশ তরু চক্রবর্তী। তিনি তাঁর বক্তব্যে বলেন, “কমরেড ষড়ানন মুখার্জি শুধু একজন নেতা ছিলেন না, তিনি ছিলেন আমাদের প্রেরণা, আমাদের পথপ্রদর্শক। তাঁর আত্মত্যাগ আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে গণতন্ত্রের জন্য লড়াই কখনো সহজ নয়, কিন্তু তা কখনো বৃথা যায় না।”
দুর্গাপুরের প্রাক্তন বিধায়ক সন্তোষ দেবরায় তাঁর বক্তৃতায় গভীর আবেগ নিয়ে বলেন, “একজন শ্রমিক হয়েও ষড়ানন মুখার্জি ছিলেন একজন সাংস্কৃতিক যোদ্ধা। তিনি শুধু শ্রমিকদের অধিকারের জন্য লড়েননি, তিনি সংস্কৃতির মাধ্যমে মানুষের মনে গণতন্ত্রের বীজ বুনেছিলেন। তৎকালীন কংগ্রেসের দুষ্কৃতীদের হাতে তিনি প্রাণ হারিয়েছেন, কিন্তু তাঁর আদর্শ আজও আমাদের মধ্যে জীবিত। দুর্গাপুরের শ্রমজীবী মানুষ তাঁর সেই স্বপ্নকে বুকে ধরে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন।” তাঁর কণ্ঠে ছিল গর্ব, আবেগ আর অটল প্রত্যয়ের মিশেল।
সিপিআই(এম) দুর্গাপুর ইস্পাত ২ এরিয়ার পক্ষ থেকে স্বপন সরকার তাঁর বক্তব্যে ষড়ানন মুখার্জির সংগ্রামী জীবনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “কমরেড সরননের জীবন আমাদের শেখায় যে সত্যের পথে চলতে গেলে ভয় পাওয়া যায় না। তাঁর রক্তের সঙ্গে মিশে আছে দুর্গাপুরের মাটির গন্ধ, আর সেই মাটিতে আজও ফুটে উঠছে সংগ্রামের ফুল।”
হিন্দুস্তান স্টিল এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের পক্ষ থেকে সন্দীপ পাল বলেন, “ষড়ানন মুখার্জি আমাদের শ্রমিক আন্দোলনের এক অমর নক্ষত্র। তাঁর আদর্শ আমাদের প্রতিটি পদক্ষেপে পথ দেখায়। তিনি শুধু একজন নেতা ছিলেন না, তিনি ছিলেন আমাদের নেতা, আমাদের সঙ্গী।”
এছাড়াও ষড়ানন মুখার্জির সহকর্মী, প্রাক্তন নেতা সুখময় বস তাঁর স্মৃতিচারণে সরননের সঙ্গে কাটানো মুহূর্তগুলোর কথা বলতে গিয়ে আবেগে ভেঙে পড়েন। তিনি বলেন, “সরনন ছিলেন আমাদের সকলের প্রাণ। তাঁর হাসি, তাঁর সাহস, তাঁর স্বপ্ন—এসব কখনো ভোলা যায় না।”
স্মরণ সভায় উপস্থিত ছিলেন গণতান্ত্রিক আন্দোলনের একাধিক নেতৃবৃন্দ এবং শ্রমজীবী মানুষ। তানসেন মোড়ে জড়ো হওয়া শত শত মানুষের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। অনেকের চোখে জল, হৃদয়ে শ্রদ্ধা আর মনে অটুট প্রতিজ্ঞা—কমরেড সরনন মুখার্জির আদর্শকে বাঁচিয়ে রাখতে তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সভায় সাংস্কৃতিক পরিবেশনার মাধ্যমে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়। বক্তৃতার মধ্য দিয়ে উঠে আসে সেই অমর সংগ্রামের কথা, যা দুর্গাপুরের ইতিহাসে চিরকাল অম্লান থাকবে।
কমরেড ষড়ানন মুখার্জি ও তাঁর সহযোদ্ধাদের আত্মত্যাগ আজও দুর্গাপুরের শ্রমজীবী মানুষের মনে প্রেরণার আলো জ্বালিয়ে রেখেছে। তাঁদের রক্তে রঞ্জিত এই মাটি আজও বলছে—গণতন্ত্রের লড়াই চলবে, শ্রমিকদের অধিকারের সংগ্রাম কখনো থামবে না।