খিদিরপুর বাজারে বিধ্বংসী আগুন: স্বপ্ন ভস্মীভূত, ব্যবসায়ীদের হৃদয়ভাঙা কান্না
কলকাতার খিদিরপুর অরফ্যানগঞ্জ বাজারে গত রবিবার (১৫ জুন) গভীর রাতে এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে সবকিছু ছাই হয়ে গেছে। রাত ১টার পর শুরু হওয়া এই আগুন যেন এক মুহূর্তে শতাব্দী প্রাচীন এই বাজারের জীবন্ত হৃদস্পন্দনকে গ্রাস করে নিয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, প্রায় ১৩০০ দোকান পুড়ে ছাই হয়ে গেছে, যদিও কাউন্সিলরের দাবি এই সংখ্যা ৪০০-র কাছাকাছি। মাখন পট্টি থেকে ছড়িয়ে পড়া এই আগুন মসলা পট্টি, ফলপট্টি, সবজির দোকান, এমনকি তেলের গোডাউনকেও গ্রাস করেছে। প্লাস্টিকের বস্তা আর তেলের উপস্থিতিতে আগুন যেন আরও উন্মত্ত হয়ে উঠেছিল, কোনও কিছুই রেহাই পায়নি।
ঘটনাস্থলে দাঁড়িয়ে চোখে পড়ে শুধু ধ্বংসস্তূপ। দেওয়ালে কালো ছাইয়ের আস্তরণ, ভেঙে পড়া চাল, আর এখনও ধোঁয়া বেরিয়ে আসছে ধ্বংসস্তূপ থেকে। এই বাজার, যেখানে প্রতিদিন হাজারো মানুষের পদচারণায় মুখরিত হতো, আজ নিস্তব্ধ। ব্যবসায়ীদের চোখে-মুখে শুধু হতাশা আর অসহায়তা। একজন দোকানদার কান্নায় ভেঙে পড়ে বললেন, “আমার সব শেষ! বছরের পর বছর ধরে গড়া স্বপ্ন, সঞ্চয়, সব পুড়ে ছাই হয়ে গেল। আমরা বরবাদ হয়ে গেছি।”
দমকলের গাফিলতিতে জ্বলে গেল জীবনের আশা: ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, আগুন লাগার খবর দেওয়ার পরও দমকল প্রায় দুই থেকে তিন ঘণ্টা দেরিতে পৌঁছায়। যখন এল, তখন তাদের ইঞ্জিনে জল ছিল না, প্রেসার ছিল না। একজন ব্যবসায়ী ক্ষোভে বলেন, “দমকল এসে ১০ মিনিট জল দিয়েছে, তারপর বলছে জল ফুরিয়ে গেছে! ততক্ষণে আগুন পুরো বাজার গ্রাস করেছে।” ২০টি দমকল ইঞ্জিন মোতায়েন করা হলেও, সোমবার সকাল পর্যন্ত আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। একজন কান্নাজড়িত কণ্ঠে বললেন, “ওয়াটগঞ্জ থানা আমাদের ফোনই ধরেনি। আমরা চিৎকার করে ডেকেছি, কিন্তু কেউ আসেনি।”
এক সেকেন্ডে সব হারিয়ে গেল: একজন দোকানদারের কথায় উঠে এল হৃদয়বিদারক গল্প। তিনি বলেন, “আমি শুনলাম খটখট আওয়াজ। দরজা খুলে দেখি, চারদিকে আগুন! দৌড়ে কাউন্টার থেকে টাকা বার করতে গেলাম, কিন্তু হাত পুড়ে গেল, প্যান্ট পুড়ে গেল। এক সেকেন্ড সময় পেলাম না।” এই বাজারে ১৮৫৭ সাল থেকে ব্যবসা চলছিল, অনেকে এখানেই রাত কাটাতেন। কিন্তু এই আগুন তাদের সব কেড়ে নিয়েছে।
প্রশাসনের উদাসীনতা আর ষড়যন্ত্রের গুঞ্জন: ব্যবসায়ীরা কলকাতা পুরসভার (কেএমসি) বিরুদ্ধে গাফিলতির অভিযোগ তুলছেন। বাজারে কোনও জলের রিজার্ভার বা অগ্নিনির্বাপন ব্যবস্থা ছিল না। সম্প্রতি এই বাজার কেএমসি-র হাতে হস্তান্তরিত হয়েছিল, কিন্তু কেন এমন অবহেলা? কেউ কেউ ষড়যন্ত্রের আশঙ্কাও প্রকাশ করছেন। এক্স-এ একটি পোস্টে দাবি করা হয়েছে, এই বাজারে ৮০% হিন্দু ব্যবসায়ী ছিলেন এবং জমি হস্তান্তরের কথা চলছিল। যদিও এই দাবি যাচাই করা যায়নি, তবু এটি ব্যবসায়ীদের মনে ক্ষোভ আর অবিশ্বাস জন্ম দিয়েছে।
একটি বাজার, হাজারো স্বপ্নের ধ্বংসস্তূপ: সাত ঘণ্টার অক্লান্ত চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে এলেও, এখনও ধ্বংসস্তূপে পকেট ফায়ারের খোঁজ চলছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, তাদের জীবনের সব সঞ্চয়, স্বপ্ন, পরিশ্রম এই আগুনে ভস্ম হয়ে গেছে। তারা সরকারের কাছে ক্ষতিপূরণ ও পুনর্গঠনের দাবি জানিয়েছেন। কিন্তু এই হৃদয়বিদারক ক্ষতি কীভাবে পূরণ হবে? খিদিরপুরের এই বাজার শুধু একটি বাজার নয়, এটি ছিল হাজারো পরিবারের জীবিকার ভরসা। আজ তাদের চোখে শুধু অশ্রু আর হতাশার কালো ছায়া।

