কলকাতা, ১৬ আগস্ট, ২০২৫: আজ থেকে ঠিক ১০০ বছর আগে, ১৯২৫ সালের ১৫ আগস্ট কলকাতার কালীঘাটের ৪৩, মহিম হালদার স্ট্রিটের মাতুলালয়ে এক বিপ্লবী কবির জন্ম হয়েছিল। তিনি সুকান্ত ভট্টাচার্য। তাঁর পৈতৃক নিবাস ছিল তৎকালীন ফরিদপুর জেলার কোটালিপাড়া থানার ঊনশিয়া গ্রামে, যা বর্তমানে বাংলাদেশের গোপালগঞ্জ জেলার অন্তর্ভুক্ত। মাত্র ২০ বছর বয়সে যক্ষ্মারোগে আক্রান্ত হয়ে ১৯৪৭ সালের ১৩ মে তাঁর অকালমৃত্যু হলেও, তাঁর বিপ্লবী চেতনা আজও সমাজের প্রতিটি স্তরে এক নতুন আলোর দিশা দেখায়। তাই তাঁর শততম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষ্যে পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরা জুড়ে শুরু হয়েছে বছরব্যাপী আবেগপূর্ণ এবং অনুপ্রেরণামূলক নানা কর্মসূচি।
এক জীবন, এক মশাল
সুকান্ত ভট্টাচার্যের জীবন ছিল উল্কার মতো। যে বয়সে তরুণরা স্বপ্ন বোনে, সেই বয়সে তিনি তাঁর কলমকে শোষণের বিরুদ্ধে এক ধারালো তলোয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। জীবনের শুরু থেকেই তিনি গভীর ব্যক্তিগত শোকের সম্মুখীন হন। প্রথমে তাঁর প্রিয় জেঠতুতো বোন রাণীদির মৃত্যু, যিনি তাঁকে প্রথম সাহিত্যের জগতে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন, এবং এর কিছুদিন পরেই তাঁর মায়ের চিরবিদায় তাঁকে গভীরভাবে নিঃসঙ্গ করে তোলে। এই শোকের মুহূর্তে কবিতাই তাঁর একমাত্র সঙ্গী ও আশ্রয় হয়ে ওঠে।
রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের ছায়ায় থেকেও তিনি নিজস্ব এক পথ তৈরি করেছিলেন, যেখানে রোম্যান্টিকতার চেয়ে জীবনের কঠোর বাস্তবতা ছিল বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৪৩ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ যখন লাখ লাখ মানুষের জীবন কেড়ে নিচ্ছিল, সুকান্ত তখন "পূর্ণিমার চাঁদকে" "ঝলসানো রুটি"র সঙ্গে তুলনা করে ক্ষুধার্ত মানুষের আর্তনাদ তুলে ধরেছিলেন। তাঁর কবিতা কেবল শব্দ ছিল না, ছিল বঞ্চিত মানুষের বুকফাটা কান্না এবং শোষণের বিরুদ্ধে এক জ্বালাময়ী প্রতিবাদ।
তাঁর জীবনের বেশিরভাগ কবিতাই মরণোত্তর প্রকাশিত হয়েছে। তবুও, তাঁর "ছাড়পত্র", "ঘুম নেই", বা "দুর্মর"-এর মতো কবিতাগুলো লক্ষ লক্ষ মানুষের হৃদয়ে এক চিরস্থায়ী আসন করে নিয়েছে। বিশেষ করে "জ্বলে পুড়ে-মরে ছারখার তবু মাথা নোয়াবার নয়"—এই পংক্তিটি আজও সকল প্রতিকূলতার মুখে মানুষকে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর প্রেরণা জোগায়। তাঁর বিপ্লবী চেতনা, যা ব্রিটিশ শাসন, দুর্ভিক্ষ, এবং যুদ্ধের মতো তৎকালীন সমাজের গভীর সংকটগুলিকে সরাসরি তুলে ধরেছিল, তাঁর স্বল্পকালীন জীবনকে অতিক্রম করে এক চিরন্তন আবেদন তৈরি করেছিল।
কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে সম্পর্ক
সুকান্তের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক ছিল ১৯৪৪ সালে মাত্র ১৭ বছর বয়সে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ লাভ। তৎকালীন সময়ে পার্টি সদস্যপদ লাভ করা সহজ ছিল না। একই বছর, তিনি ফ্যাসিবাদ-বিরোধী লেখক ও শিল্পী সংঘের তত্ত্বাবধানে 'আকাল' (দুর্ভিক্ষ) নামক একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকলন গ্রন্থ সম্পাদনা করেন। ১৯৪৬ সাল থেকে তিনি কমিউনিস্ট পার্টির বাংলা দৈনিক মুখপত্র 'দৈনিক স্বাধীনতা'-এর 'কিশোর সভা' বিভাগের সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। কমিউনিস্ট পার্টির প্রতি তাঁর নিবেদন ছিল গভীর; তিনি প্রায়শই রাত জেগে পার্টির কাজ করতেন এবং সাধারণ মানুষের জন্য কবিতা লিখতেন। তাঁর এই শিক্ষাজীবন ত্যাগ করে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পূর্ণভাবে যুক্ত হওয়া কেবল একটি ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত ছিল না, বরং তৎকালীন ঔপনিবেশিক বাংলার বুদ্ধিজীবী ও যুবসমাজের মধ্যে একটি বৃহত্তর প্রবণতার প্রতিফলন ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ এবং উপনিবেশ-বিরোধী সংগ্রামের তীব্রতার কারণে অনেক তরুণ প্রচলিত শিক্ষাপথের চেয়ে সক্রিয় রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ও সামাজিক রূপান্তরকে অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন। সুকান্তের জীবন তাই বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে বাংলার বিপ্লবী বুদ্ধিজীবী আন্দোলনের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত, যেখানে সাহিত্য ও সক্রিয়তা মুক্তির অবিচ্ছেদ্য হাতিয়ার হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল।
শতবর্ষে স্বপ্নের পুনরুত্থান
সুকান্তের এই শতবার্ষিকী কেবল একজন কবির জন্মস্মৃতি নয়, বরং তাঁর আদর্শের পুনরুত্থান। এই উপলক্ষ্যে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন স্থানে ছাত্র-যুব সংগঠন, স্কুল ও কলেজগুলি নানা ধরনের অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। কলকাতার মৌলালিতে স্টুডেন্টস হেলথ হোম (SHH) বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা, রক্তদান শিবির এবং সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার মাধ্যমে সুকান্তর মানবিক আদর্শকে তুলে ধরছে। অন্যদিকে, ছাত্র-যুব সংগঠন এসএফআই-ডিওয়াইএফআই ৬০০-এর বেশি জায়গায় ছাত্র-যুব উৎসবের আয়োজন করে তরুণ প্রজন্মকে সাহিত্য, বিতর্ক এবং গণসঙ্গীতের মাধ্যমে তাঁর বিপ্লবী চেতনা সম্পর্কে সচেতন করে তুলছে।
তাঁর স্বল্পায়ু জীবন এবং তাঁর কাজের বিশাল প্রভাবের মধ্যে একটি গভীর সম্পর্ক বিদ্যমান। তাঁর বিপ্লবী চেতনার কাব্য, যা ব্রিটিশ শাসন, দুর্ভিক্ষ, এবং যুদ্ধের মতো তৎকালীন সমাজের গভীর সংকটগুলিকে সরাসরি তুলে ধরেছিল, তাঁর স্বল্পকালীন জীবনকে অতিক্রম করে এক চিরন্তন আবেদন তৈরি করেছিল। তাঁর কবিতার তীব্রতা, সততা এবং সমসাময়িক প্রাসঙ্গিকতা তাঁর শারীরিক অস্তিত্বের সীমাবদ্ধতাকে ছাপিয়ে গিয়েছিল, যার ফলে তাঁর মৃত্যুর পরেও তাঁর প্রভাব ব্যাপক ও স্থায়ী হয়েছিল। এই শতবার্ষিকী কেবল একটি স্মরণের উপলক্ষ্য নয়, বরং তাঁর বিপ্লবী আদর্শের চিরন্তন প্রাসঙ্গিকতা এবং সমসাময়িক সমাজে তার গুরুত্ব পুনর্মূল্যায়নের এক গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ।
এই শতবর্ষ উদযাপন আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, বিপ্লব কেবল রাজনৈতিক স্লোগানে নয়, বরং মানুষের হৃদয়ের গভীরে প্রোথিত ন্যায় ও মানবিকতার আকাঙ্ক্ষায় নিহিত। সুকান্ত ভট্টাচার্য তাঁর কাজের মধ্য দিয়ে চিরকাল অমর হয়ে থাকবেন, এক বিপ্লবী আলোকবর্তিকা হিসেবে যা অনাগত প্রজন্মকে পথ দেখাবে।


