নিজস্ব সংবাদদাতা, আসানসোল ও দুর্গাপুর:
শিল্পাঞ্চলের মাটি খুঁড়লে কি শুধুই কয়লা বেরোয়? নাকি বেরোয় দুর্নীতির কালো টাকা? মঙ্গলবার ভোর থেকে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ED)-এর ম্যারাথন তল্লাশিতে যে চিত্র উঠে এল, তাতে লজ্জায় মাথা নত সাধারণ মানুষের। যাঁদের হাতে আইন-শৃঙ্খলার ভার, যাঁদের ওপর ভরসা করে ঘুমোতে যায় সাধারণ নাগরিক, আজ তাঁদের দরজাতেই কড়া নাড়ছে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা। কয়লা পাচার কাণ্ডে (Coal Scam) এবার ইডির স্ক্যানারে খোদ পুলিশ আধিকারিক থেকে শুরু করে প্রভাবশালী ব্যবসায়ীরা।
খাকি উর্দির আড়ালে কালো কারবার?
দুর্গাপুরের সিটি সেন্টারের বিলাসবহুল আবাসন। বাইরে কেন্দ্রীয় বাহিনীর কড়া পাহারা। ভেতরে চলছে জেরা। কিন্তু জেরা কাকে? তিনি কোনো সাধারণ দাগী আসামি নন, তিনি রাজ্যের পুলিশ আধিকারিক মনোরঞ্জন মন্ডল! যিনি বর্তমানে বুদবুদ থানার ওসি পদে নিযুক্ত হওয়ার অপেক্ষায় ছিলেন, এবং একসময় আসানসোল-দুর্গাপুর পুলিশ কমিশনারেটের স্পেশাল ব্রাঞ্চে (SB) কর্মরত ছিলেন।
ইডির হাতে আসা তথাকথিত 'মাফিয়া ডায়েরি'-তে নাকি সাঙ্কেতিকভাবে মিলেছে এই অফিসারের নাম। অভিযোগ মারাত্মক— দিনের পর দিন কয়লা মাফিয়াদের থেকে 'প্রোটেকশন মানি' বা মাসোহারা নেওয়ার অভিযোগ উঠছে তাঁর বিরুদ্ধে। সাধারণ মানুষের প্রশ্ন, চোর ধরবে পুলিশ, কিন্তু পুলিশকে ধরবে কে? ইডির আধিকারিকরা জানতে চাইছেন, এই টাকা কি শুধুই ওসি-র পকেটে যেত, নাকি এই 'কাটমানি'র ভাগ পৌঁছে যেত আরও ওপরতলার কোনো প্রভাবশালী নেতার কাছে? সকাল থেকে রাত পর্যন্ত চলা এই জিজ্ঞাসাবাদের নেপথ্যে কি লুকিয়ে আছে আরও বড় কোনো রাঘববোয়ালের নাম?
জামুড়িয়ায় যকের ধন! মেশিন এনেও গোনা যাচ্ছে না টাকা
অন্যদিকে নজর ঘোরানো যাক জামুড়িয়ার দিকে। ব্যবসায়ী অমিত বনশালের বাড়ি এখন যেন টাকার খনি। ইডি সূত্রে খবর, তল্লাশি চালিয়ে এখনও পর্যন্ত ৭০ লক্ষেরও বেশি নগদ টাকা উদ্ধার হয়েছে। টাকার পরিমাণ এতই বিপুল যে, মানুষের হাতে গোনা সম্ভব হয়নি। স্থানীয় স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া থেকে তলব করতে হয়েছে ব্যাঙ্ক কর্মীদের, আনা হয়েছে তিনটি টাকা গোনার মেশিন!
আমজনতার মনে একটাই প্রশ্ন, একজন ব্যবসায়ীর বাড়িতে এত নগদ টাকা কেন? এই টাকা কি কয়লা সিন্ডিকেটের? কালো টাকাকে সাদা করার মেশিনারি হিসেবেই কি কাজ করতেন এই অমিত বনশাল?
বালিতেও কি মাফিয়ার থাবা?
কয়লার কালিমার রেশ কাটতে না কাটতেই সামনে আসছে বালি মাফিয়াদের নামও। দুর্গাপুরের সেপকো টাউনশিপে বালি ব্যবসায়ী প্রবীর দত্তর বাড়িতেও হানা দিয়েছে ইডি। পাণ্ডবেশ্বর থেকে আসানসোল—গোটা শিল্পাঞ্চল জুড়ে চলছে তল্লাশি।
জনতার ক্ষোভ ও প্রতিবাদ
আজকের এই অভিযানের পর সাধারণ মানুষের ক্ষোভ ফেটে পড়ছে। তাঁদের বক্তব্য স্পষ্ট—
১. পুলিশ যদি মাফিয়ার থেকে টাকা খেয়ে তাদের প্রোটেকশন দেয়, তবে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কোথায়?
২. দিনের আলোয় লরি লরি কয়লা পাচার হলো, আর প্রশাসনের কেউ কিছু জানল না—এটা কি বিশ্বাসযোগ্য?
৩. উদ্ধার হওয়া এই কোটি কোটি টাকা কি জনগণের সম্পদ নয়?
মঙ্গলবারের এই অভিযান প্রমাণ করে দিল, কয়লা দুর্নীতির শিকড় অনেক গভীরে। শুধু চুনোপুঁটি নয়, এবার ইডির নজরে রাঘববোয়ালরা। তবে তদন্ত কি শেষ পর্যন্ত পৌঁছবে? নাকি প্রতিবারের মতো এবারও ফাইল চাপা পড়ে যাবে? রক্ষক যখন ভক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়, তখন সমাজের মেরুদণ্ড ভেঙে যায়। মানুষ তাকিয়ে আছে, কবে খুলবে এই দুর্নীতির মুখোশ, কবে শাস্তি পাবে এই লুটেরারা।
ট্যাগ: #CoalScam #EDRaid #WestBengalNews #Asansol #Corruption #PoliceRaid #MoneyLaundering #TrendingNow