সান্তিয়াগো, চিলি: সান্তিয়াগোর রাতটি আজ দ্বিখণ্ডিত। শহরের একাংশে যখন বিজয়ের উল্লাস, আতশবাজির রোশনাই আর 'চিলি রক্ষা'র স্লোগান, তখন অন্য অংশে নেমে এসেছে এক গভীর, বিষাদগ্রস্ত নীরবতা। গত ৩৫ বছর ধরে যে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও মানবাধিকারের ওপর ভিত্তি করে চিলি তার আধুনিক পরিচয় গড়ে তুলেছিল, আজ ব্যালট বাক্সে সেই পরিচয়ের ওপর এক বড়সড় আঘাত হেনেছে দেশটির জনগণ। বামপন্থী জোটের স্বপ্ন ধূলিসাৎ করে চিলির প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন কট্টর ডানপন্থী নেতা হোসে অ্যান্টোনিও কাস্ট।
জ্যানেট জারা: এক লড়াকু বিদায়
বামপন্থী জোট এবং কমিউনিস্ট পার্টির প্রার্থী জ্যানেট জারা ছিলেন শ্রমজীবী ও সাধারণ মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। কিন্তু নির্বাচনের ফলাফল যখন আসতে শুরু করে, তখনই স্পষ্ট হয়ে যায় যে চিলির রাজনৈতিক মানচিত্র ডানদিকে হেলে পড়েছে। প্রায় ১৬ শতাংশ ভোটের বিশাল ব্যবধানে পরাজয় বরণ করতে হয়েছে জারাকে।
ফলাফল ঘোষণার পর মঞ্চে যখন তিনি এসে দাঁড়ালেন, তাঁর মুখে ছিল এক সকরুণ হাসি। তিনি পরাজয় মেনে নিলেন, কাস্টকে অভিনন্দনও জানালেন। তিনি বললেন, "চিলির মঙ্গলের জন্য আমি তাঁর সাফল্য কামনা করি।" কিন্তু তাঁর এই সৌজন্যবোধের আড়ালে লুকিয়ে ছিল এক গভীর ক্ষত। মঞ্চে তাঁর পেছনে দাঁড়ানো কর্মীদের চোখে ছিল জল। এটি কেবল একটি নির্বাচনী পরাজয় নয়, বরং কয়েক দশক ধরে গড়ে তোলা সামাজিক ন্যায়বিচার, নারী অধিকার এবং সমতার আন্দোলনের জন্য এক বড় ধাক্কা।
বোরিচের বিষাদ ও প্রথার দায়বদ্ধতা
বিদায়ী বামপন্থী প্রেসিডেন্ট গ্যাব্রিয়েল বোরিচের জন্য এই সন্ধ্যাটি ছিল সম্ভবত তাঁর রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম কঠিন মুহূর্ত। চিলির দীর্ঘদিনের প্রথা মেনে তিনি টেলিফোনে কাস্টকে অভিনন্দন জানান। কিন্তু সেই কথোপকথনে বোরিচের কণ্ঠে ছিল স্পষ্ট হতাশা। যে প্রগতিশীল সংবিধান এবং সমাজতান্ত্রিক সংস্কারের স্বপ্ন তিনি দেখিয়েছিলেন, কাস্টের বিজয় কার্যত সেই সব সংস্কারকে আস্তাকুঁড়ে ফেলার ইঙ্গিত দেয়। বোরিচের প্রশাসন যে মানবিক চিলি গড়তে চেয়েছিল, তা আজ 'ল অ্যান্ড অর্ডার' বা কঠোর অনুশাসনের রাজনীতির কাছে পরাস্ত।
পিনোশের ছায়া ও ভয়ের সংস্কৃতি
সবচেয়ে আতঙ্কজনক দৃশ্যটি দেখা গেছে কাস্টের বিজয় মিছিলে। সেখানে কাস্টের অনেক সমর্থকের হাতে উড়ছিল সাবেক স্বৈরশাসক জেনারেল অগাস্টো পিনোশের ছবি সম্বলিত পতাকা। যে পিনোশের শাসনামলে হাজার হাজার বামপন্থী নেতাকর্মীকে হত্যা ও গুম করা হয়েছিল, আজ সেই স্বৈরশাসকের ভাবাদর্শকে 'বৈধতা' দেওয়ার এক উন্মাদনা দেখা গেছে রাজপথে।
কাস্ট নিজে পিনোশের একনিষ্ঠ ভক্ত হিসেবে পরিচিত। নির্বাচনের প্রচারাভিযানে তিনি বারবার আইনশৃঙ্খলার দোহাই দিয়ে অভিবাসন বিরোধী কঠোর অবস্থান এবং বামপন্থী মতাদর্শকে দমনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। মানবাধিকার কর্মীরা আশঙ্কা করছেন, কাস্টের এই বিজয় চিলিকে আবারও সেই অন্ধকার যুগে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পারে, যেখানে ভিন্নমত মানেই ছিল রাষ্ট্রদ্রোহিতা।
জনগণের রায় নাকি ভয়ের জয়?
বিশ্লেষকরা বলছেন, কাস্টের এই ভূমিধস বিজয়ের পেছনে কাজ করেছে মূলত 'ভয়'। ক্রমবর্ধমান অপরাধ, অনিয়ন্ত্রিত অভিবাসন এবং অর্থনৈতিক অস্থিরতাকে পুঁজি করে কাস্ট সাধারণ মানুষের মনে এক ধরনের নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন। তিনি শান্তি ও শৃঙ্খলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, কিন্তু বামপন্থীদের প্রশ্ন—স্বাধীনতার বিনিময়ে কি এই শৃঙ্খলা কাম্য?
অনেকেই মনে করছেন, চিলির মধ্যপন্থী ও দোদুল্যমান ভোটাররা এবার উগ্র ডানপন্থার দিকে ঝুঁকেছেন কেবল তাৎক্ষণিক নিরাপত্তার আশায়। কিন্তু এর সুদূরপ্রসারী ফলাফল নিয়ে তাঁরা ভাবেননি। জ্যানেট জারা ও তাঁর দল এই ভয়ের রাজনীতির বিপরীতে দাঁড়িয়ে সংহতি ও মানবতার কথা বলেছিলেন, কিন্তু উগ্র জাতীয়তাবাদের জোয়ারে সেই বার্তা ভেসে গেছে।
কৌশলী কাস্ট ও আগামীর শঙ্কা
বিজয় নিশ্চিত হওয়ার পর কাস্ট একটি চতুর রাজনৈতিক চাল চেলেছেন। তিনি তাঁর নিজের উগ্র রক্ষণশীল দল 'রিপাবলিকান পার্টি' থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন। তাঁর দাবি, তিনি সকল চিলিয়ানদের প্রেসিডেন্ট হতে চান এবং বিভেদ কমাতে চান। কিন্তু বামপন্থী নেতারা এটাকে দেখছেন নিছকই এক লোকদেখানো কৌশল হিসেবে। তাঁদের মতে, কাস্ট যতই উদার সাজার চেষ্টা করুন না কেন, তাঁর এজেন্ডা মূলত অতি-রক্ষণশীল এবং কর্পোরেট স্বার্থবান্ধব।
অন্ধকারের শেষে কি আলো আছে?
আজকের রাতটি চিলির বামপন্থী রাজনীতির জন্য এক বড় ট্র্যাজেডি। যে প্রজন্ম স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে লড়াই করে গণতন্ত্র এনেছিল, তাঁদের কাছে কাস্টের এই উত্থান এক দুঃস্বপ্ন। সান্তিয়াগোর রাজপথ আজ হয়তো কাস্টের স্লোগানে মুখর, কিন্তু গলির মোড়ে মোড়ে প্রগতিশীল তরুণেরা আজ স্তব্ধ।
তবে ইতিহাস বলে, চিলির মানুষ হার মানতে জানে না। জ্যানেট জারা হয়তো আজ হেরে গেছেন, কিন্তু যে আদর্শের মশাল তিনি বহন করেছেন, তা নিভে যায়নি। কট্টর ডানপন্থার এই ঝড়ের মুখে দাঁড়িয়ে বামপন্থীদের এখন নতুন করে সংগঠিত হওয়ার সময়। আজকের এই কান্না হয়তো আগামী দিনের প্রতিরোধের বারুদ হয়েই ফিরে আসবে।