নয়াদিল্লি, ৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬: ভারতের রাজধানী দিল্লির শীতের কুয়াশা কি কেবল ধোঁয়াসা তৈরি করে, নাকি তার আড়ালে ঢেকে ফেলে হাজার হাজার অসহায় আর্তনাদ? ২০২৬ সালের ক্যালেন্ডার মাত্র খুলতে না খুলতেই দিল্লির বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে নিখোঁজ মানুষের স্বজনদের কান্নায়। বছরের প্রথম ১৫ দিন কাটতে না কাটতেই শহরটি থেকে হারিয়ে গেছেন ৮০৭ জন মানুষ। অর্থাৎ, গত ১৫ দিনে দিল্লির অন্তত ৮০৭টি পরিবার তাদের প্রিয়জনের শূন্য ঘরের দিকে তাকিয়ে রাত কাটাচ্ছে।
পরিসংখ্যান নয়, এ যেন এক একটি দুঃস্বপ্ন
কাগজে-কলমে সংখ্যাগুলো কেবল অংক মনে হতে পারে, কিন্তু এর গভীরের ক্ষত অত্যন্ত ভয়াবহ। প্রতিদিন গড়ে ৫৪ জন মানুষ দিল্লির ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছেন। এদের মধ্যে ৫০৯ জনই নারী ও কিশোরী।
দিল্লি পুলিশের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১ থেকে ১৫ জানুয়ারির মধ্যে:
৬১৬ জন প্রাপ্তবয়স্কের মধ্যে ৩৬৩ জনই নারী। তাদের মধ্যে ৪৩৫ জনের ভাগ্যে কী জুটেছে, তারা বেঁচে আছেন না মারা গেছেন, তা এখনো অজানা।
১৯১ জন শিশুর মধ্যে ১৪৬ জন কন্যাসন্তান। ১৬৯ জন কিশোর-কিশোরীর মধ্যে ১৪৩ জন এখনো ফেরেনি মায়ের কোলে।
ফেব্রুয়ারির এই কনকনে শীতে যখন দিল্লির সাধারণ মানুষ উষ্ণতা খুঁজছে, তখন ৫৭২টি পরিবারের বুক ফেটে যাচ্ছে নিখোঁজ স্বজনদের শঙ্কায়।
বিশ্বাসের নামে বিষ: যেভাবে ছড়ানো হচ্ছে পাচারের জাল
দিল্লি আজ কেবল ভারতের রাজধানী নয়, বরং হয়ে উঠেছে পাচারের এক অন্ধকার ট্রানজিট পয়েন্ট। এই পাচারচক্রের সবথেকে নিষ্ঠুর দিক হলো 'বিশ্বাসঘাতকতা'। অধিকাংশ ক্ষেত্রে পাচারকারীরা অচেনা কেউ নয়; বরং খুব কাছের আত্মীয়, প্রতিবেশী বা দীর্ঘদিনের বন্ধু।
একটি সাজানো সুন্দর জীবনের স্বপ্ন দেখিয়ে—হয়তো ভালো চাকরি, নয়তো বিয়ের প্রলোভনে—গ্রামের সহজ-সরল মেয়েদের নিয়ে আসা হয় এই যান্ত্রিক শহরে। এরপর শুরু হয় বিভীষিকা। তাদের ফোন কেড়ে নেওয়া হয়, ছিঁড়ে ফেলা হয় পরিচয়পত্র। সামান্য একটু খাবারের বদলে তাদের ওপর চালানো হয় অমানুষিক নির্যাতন। 'ঋণের বোঝা' চাপিয়ে দিয়ে তাদের বাধ্য করা হয় এমন এক নরকে নামতে, যেখান থেকে ফেরার পথ প্রায় রুদ্ধ।
গুমরে মরা দীর্ঘশ্বাস: সারভাইভারদের বয়ানে নরকের চিত্র
উদ্ধার পাওয়া কয়েকজনের বয়ান শুনলে শিউরে উঠতে হয়। মুম্বাইয়ের একটি যৌনপল্লী থেকে কোনোমতে প্রাণ হাতে নিয়ে পালানো সামিরা (নাম পরিবর্তিত) বলেছিলেন:
"কাজ না করলে খাবার জুটত না। মালিক তো বটেই, খদ্দেররাও বেল্ট দিয়ে মারত। আমার হাতে জ্বলন্ত সিগারেটের ছ্যাকা দেওয়া হয়েছিল। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত শরীর যেন আর নিজের ছিল না।"
দিল্লির পাহারগঞ্জের এক অন্ধকার ঘর থেকে উদ্ধার হওয়া রশ্নি কাঁদতেন তার ছোট সন্তানদের জন্য। কিন্তু কান্নার অপরাধে জুটত খুন্তির পিটুনি। আর শাজিয়া, যাকে দিনে অন্তত ২০ জন পুরুষের লালসার শিকার হতে হতো, অসুস্থ অবস্থাতেও মেলেনি যার নিস্তার।
এগুলো কেবল গল্প নয়, দিল্লির অলিতে-গলিতে প্রতিদিন ঘটে যাওয়া এক চরম বাস্তবতা।
কোথায় হারিয়ে যাচ্ছে তারা?
দিল্লি থেকে পাচার হওয়া এই নারী ও শিশুদের জাল ছড়িয়ে আছে অনেক দূর পর্যন্ত। ভারতের অভ্যন্তরীণ বড় শহরগুলো ছাড়াও এদের পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে দুবাই, সৌদি আরব বা কুয়েতের মতো দেশগুলোতে। বর্তমানে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে 'সাইবার দাস' হিসেবেও অনেক তরুণকে পাচার করার খবর পাওয়া যাচ্ছে।
যদিও পুলিশ 'অপারেশন মিলাপ'-এর মাধ্যমে কিছু মানুষকে উদ্ধার করতে সক্ষম হচ্ছে, তবুও নিখোঁজের সংখ্যার তুলনায় তা যেন মহাসমুদ্রে এক বিন্দু জল। ২০২৫ সালে প্রায় ২৫ হাজার নিখোঁজ মামলার মধ্যে ৯ হাজার মানুষের হদিস আজও মেলেনি।
শেষ কথা
দিল্লির এই রাজপথ আজ প্রশ্ন তুলছে—নিরাপত্তা কি তবে কেবল ভিআইপিদের জন্য? সাধারণ ঘরের যে মেয়েটি কাজের খোঁজে বের হয়ে আর ফেরেনি, কিংবা যে শিশুটি খেলার ছলে হারিয়ে গেল, তাদের জন্য এই শহর কি শুধুই এক অন্ধকূপ? যতক্ষণ না সমাজ এবং প্রশাসন এই শিকড় উপড়ে ফেলছে, ততক্ষণ দিল্লির প্রতিটি মোড় থেকে এভাবেই হারিয়ে যাবে একেকটি স্বপ্ন।


