:
অনলাইন ডেস্ক: বর্তমান বিশ্বে দিনে ৮ ঘণ্টা কাজ করাকে আমরা একটি 'স্বাভাবিক' নিয়ম হিসেবে ধরে নিয়েছি। কিন্তু আপনি কি জানেন, এই ৮ ঘণ্টার হিসাবের সাথে মানবদেহের সক্ষমতা, মস্তিষ্ক বা সুস্বাস্থ্যের কোনো সরাসরি সম্পর্ক নেই? বরং এটি তৈরি হয়েছিল ১৮শ ও ১৯শ শতাব্দীর শিল্প বিপ্লবের প্রয়োজনে।
প্রাক-শিল্প বিপ্লব: যখন কাজের ছন্দ ছিল ভিন্ন
শিল্প বিপ্লবের আগে মানুষের কাজের ধরন ছিল ঋতুনির্ভর। কৃষকরা যখন প্রয়োজন হতো তখন হাড়ভাঙা খাটুনি খাটতেন, আবার বছরের অনেকটা সময় তারা বিশ্রামে কাটাতেন। কারিগররা দিনের আলোয় কাজ করতেন এবং মাঝেমধ্যে বিশ্রাম বা দুপুরে ঘুমিয়ে নিতেন। তখন শরীরই বলে দিত কখন কাজ করতে হবে আর কখন থামতে হবে।
১৯শ শতাব্দীর পরিবর্তন ও যান্ত্রিক দাসত্ব
১৯শ শতাব্দীতে যখন কলকারখানা গড়ে উঠতে শুরু করল, তখন পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন ঘটে। সাধারণ মানুষ তাদের স্বাধীনতা হারায়। সাধারণ কৃষিজমিগুলো ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে পরিণত হওয়ায় মানুষ বাধ্য হয়ে কাজের সন্ধানে শহরে ভিড় করে। শুরু হয় যান্ত্রিক এক জীবন। সেই শুরুর দিনগুলোতে শ্রমিকদের দিনে ১২, ১৪ এমনকি ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করতে হতো, সপ্তাহে ৬ দিন।
কেন ৮ ঘণ্টা?
মেশিনের কোনো ক্লান্তি নেই, কিন্তু মানুষের আছে। কলকারখানার মালিকরা দ্রুতই বুঝতে পারলেন যে, শ্রমিকদের একটানা অনেকক্ষণ খাটালে তারা অসুস্থ হয়ে পড়ে, ভুল করে এবং দ্রুত মারা যায়। আবার খুব কম সময় কাজ করালে উৎপাদন কমে যায়। তাই মানুষের সহ্যক্ষমতা এবং মেশিনের প্রয়োজনের মধ্যে এক মেলবন্ধন হিসেবে ‘৮ ঘণ্টা’র সমাধানটি সামনে আসে। ১৮১৭ সালে রবার্ট ওয়েন প্রথম এই স্লোগানটি দিয়েছিলেন:
"৮ ঘণ্টা কাজ, ৮ ঘণ্টা বিনোদন, ৮ ঘণ্টা বিশ্রাম।"
আধুনিক সময়ের পরিহাস
সবচেয়ে বড় পরিহাস হলো, আজকের দিনে উন্নত প্রযুক্তির কল্যাণে আমাদের কাজের সময় কমে আসার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবে আমরা আগের মতোই, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে তার চেয়েও বেশি কাজ করছি। ৮ ঘণ্টা কখনোই সুস্বাস্থ্যের মাপকাঠি ছিল না; এটি ছিল শিল্পব্যবস্থাকে টিকিয়ে রেখে একজন শ্রমিকের কাছ থেকে সর্বোচ্চ কাজ আদায়ের একটি কৌশল মাত্র।
আজকের এই যান্ত্রিক যুগে এসে তাই নতুন করে ভাবার সময় এসেছে—আমরা কি শরীরের প্রয়োজনে কাজ করছি, নাকি আমরাও কোনো এক বড় যন্ত্রের ছোট একটি নাট-বল্টু হয়ে গেছি?


