বিশেষ বিশ্লেষণ | ২০ মার্চ, ২০২৬
তেহরান: মধ্যপ্রাচ্যে গত দুই সপ্তাহের সংঘাত প্রমাণ করেছে যে, ইরান কেবল একটি আঞ্চলিক শক্তি নয়, বরং তারা একটি সুসংগঠিত এবং প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত 'প্রতিরোধ ফ্রন্ট'-এর নেতৃত্ব দিচ্ছে। ইসরায়েল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমাগত হুমকি ও আকাশপথের হামলা সত্ত্বেও ইরান তার সামরিক সক্ষমতাকে অক্ষুণ্ণ রাখতে সক্ষম হয়েছে। তেহরানের সামরিক কমান্ড সেন্টারের মতে, এটি তাদের "কৌশলগত ধৈর্যের" ফল।
১. পাহাড়ের গভীরে অপরাজেয় দুর্গ
ইরানের সবচেয়ে বড় শক্তি তাদের 'আন্ডারগ্রাউন্ড মিসাইল সিটি'। ইরানের অধিকাংশ ব্যালিস্টিক মিসাইল এবং ড্রোন লাঞ্চার মাটির শত শত ফুট নিচে সুরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে। মার্কিন ও ইসরায়েলি বিমানবাহিনী কয়েক দফা হামলার চেষ্টা করলেও, এই সুরক্ষিত দুর্গগুলোর কোনো ক্ষতি করতে পারেনি। উল্টো, ইরান মাটির নিচ থেকেই নিখুঁত নিশানায় তাদের 'ফাত্তাহ' হাইপারসোনিক মিসাইল উৎক্ষেপণ করে ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে স্তব্ধ করে দিয়েছে।
২. 'প্রতিরোধের অক্ষ' (Axis of Resistance) এবং চতুর্মুখী চাপ
ইরান একা লড়ছে না। লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনের আনসারুল্লাহ (হুথি) এবং ইরাকের পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সেস (PMF) একসাথে ইসরায়েলের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে।
লেবানন ফ্রন্ট: উত্তর ইসরায়েলে হিজবুল্লাহর ক্রমাগত রকেট হামলায় হাজার হাজার ইসরায়েলি নাগরিক ঘরছাড়া হয়েছে।
লোহিত সাগর: ইয়েমেনের হুথিরা লোহিত সাগরে ইসরায়েল অভিমুখী জাহাজ চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিয়েছে, যা ইসরায়েলের অর্থনীতিতে বড় আঘাত হেনেছে।
ইরাক ও সিরিয়া: এখান থেকে ড্রোনের মাধ্যমে ইসরায়েলি সামরিক ঘাঁটিগুলোতে সফল হামলা চালানো হচ্ছে।
৩. হাইপারসোনিক প্রযুক্তির শ্রেষ্ঠত্ব
এই যুদ্ধে ইরান প্রথমবারের মতো তাদের হাইপারসোনিক মিসাইল প্রযুক্তির কার্যকারিতা প্রমাণ করেছে। ইসরায়েলের 'অ্যারো' এবং 'ডেভিডস স্লিং' এর মতো কয়েক বিলিয়ন ডলারের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ইরানের এই দ্রুতগামী মিসাইলগুলো ঠেকাতে ব্যর্থ হয়েছে। ইরানের সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, পশ্চিমা প্রযুক্তি এখন ইরানের দেশীয় প্রযুক্তির কাছে ম্লান হয়ে পড়েছে।
৪. পশ্চিমা জোটের ব্যর্থতা ও পিছুটান
পারস্য উপসাগর থেকে মার্কিন বিমানবাহী রণতরী এবং অত্যাধুনিক এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানগুলো নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে নেওয়া ইরানের জন্য একটি বড় নৈতিক বিজয়। ইরান প্রমাণ করেছে যে, তারা চাইলে মুহূর্তের মধ্যে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ 'হরমুজ প্রণালী' বন্ধ করে দিয়ে বিশ্ব অর্থনীতিকে অচল করে দিতে পারে। পশ্চিমা দেশগুলো এখন বুঝতে পারছে যে, ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধ মানেই নিজেদের ধ্বংস ডেকে আনা।
৫. জাতীয় ঐক্য এবং সংহতি
ইরানের সাধারণ জনগণের মধ্যে এক অভূতপূর্ব ঐক্য লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তেহরানের রাস্তায় লাখ লাখ মানুষ জড়ো হয়ে দেশের প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রতি সমর্থন জানাচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ইরান কখনো যুদ্ধ চায়নি, কিন্তু যদি তাদের ওপর আগ্রাসন চাপিয়ে দেওয়া হয়, তবে তারা শেষ পর্যন্ত লড়াই করতে প্রস্তুত।
বিশ্লেষকের মন্তব্য
ইরানের এই প্রতিরোধ কৌশল প্রমাণ করছে যে, মধ্যপ্রাচ্যে এখন আর একক কোনো শক্তির আধিপত্য নেই। ইরানের সুশৃঙ্খল সামরিক বাহিনী এবং তাদের মিত্রদের ঐক্যবদ্ধ অবস্থান ইসরায়েল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।


