নয়াদিল্লি | বিশেষ সংবাদদাতা
ভারতের জ্বালানি স্বনির্ভরতা এবং পরিবেশগত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে এক বড় পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে কেন্দ্রীয় পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস মন্ত্রক। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী, আগামী ১ এপ্রিল ২০২৬ থেকে দেশের প্রতিটি জ্বালানি বিক্রয় কেন্দ্রে E20 পেট্রোল (২০% ইথানল মিশ্রিত পেট্রোল) সরবরাহ করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ২০৩০ সালের মূল লক্ষ্যমাত্রার পাঁচ বছর আগেই এই মাইলফলক স্পর্শ করতে চলেছে ভারত।
E20 জ্বালানি ও প্রযুক্তির প্রেক্ষাপট
E20 হলো একটি বিশেষায়িত বায়ো-ফুয়েল ব্লেন্ড, যেখানে ৮০% প্রথাগত পেট্রোলের সাথে ২০% ইথানল মিশ্রিত থাকে। এই ইথানল মূলত আখ, ভুট্টা এবং অন্যান্য শর্করা জাতীয় উদ্বৃত্ত কৃষি পণ্য থেকে উৎপাদিত হয়। ভারত সরকার ২০০৩ সালে ৫% ইথানল মিশ্রণ (E5) দিয়ে যাত্রা শুরু করে ২০২২ সালে ১০% (E10) লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করেছে।
মৌলিক পরিবর্তনের কারিগরি দিক: RON 95 স্ট্যান্ডার্ড
নতুন নির্দেশনায় সরকার ইথানল মিশ্রিত এই জ্বালানির জন্য ন্যূনতম RON (Research Octane Number) ৯৫ নির্ধারণ করেছে। ইথানলের স্বাভাবিক উচ্চ অকটেন রেটিং (১০৮.৫) সাধারণ পেট্রোলের (৮৪.৪) তুলনায় অনেক বেশি। ফলে এই মিশ্রিত জ্বালানি আধুনিক হাই-কম্প্রেশন ইঞ্জিনে দহন প্রক্রিয়াকে আরও কার্যকর করবে, যা মসৃণ ড্রাইভিং অভিজ্ঞতা এবং উন্নত এক্সিলারেশন নিশ্চিত করে।
কৌশলগত ও অর্থনৈতিক প্রভাব
সরকারের এই সিদ্ধান্তের মূলে রয়েছে তিনটি প্রধান স্তম্ভ:
আমদানি নির্ভরতা হ্রাস: ভারতের বার্ষিক অপরিশোধিত তেল আমদানির খরচ ১.১ লক্ষ কোটি টাকারও বেশি। E20-এর বাস্তবায়ন এই বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় ঘটাবে।
কার্বন নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণ: সাধারণ E10 জ্বালানির তুলনায় E20 কার্বন নিঃসরণ প্রায় ৩০% পর্যন্ত কমিয়ে জলবায়ু পরিবর্তনের মোকাবিলায় সহায়ক হবে।
কৃষি অর্থনীতির উন্নয়ন: ইথানলের চাহিদা বৃদ্ধিতে সরাসরি উপকৃত হবেন দেশের আখ ও ভুট্টা চাষীরা।
যানবাহনের ওপর প্রভাব ও ব্যবহারিক সতর্কতা
গাড়ি ও বাইক চালকদের জন্য এই পরিবর্তন মিশ্র প্রভাব ফেলতে পারে:
| যানবাহনের ধরন | সম্ভাব্য প্রভাব |
| ২০২৩-পরবর্তী মডেল (E20-Compliant) | পারফরম্যান্স স্থিতিশীল থাকবে; তবে মাইলেজে ১-২% সামান্য হ্রাস পেতে পারে। |
| ২০২৩-পূর্ববর্তী মডেল (Non-E20) | ফুয়েল হোস এবং রাবার সিল ক্ষয়ের ঝুঁকি; মাইলেজে ৫-২০% পর্যন্ত পতন ঘটার সম্ভাবনা। |
কারিগরি উদ্বেগ ও সমাধান:
ইথানলের শক্তি ঘনত্ব (Energy Density) সাধারণ পেট্রোলের চেয়ে প্রায় ৩০% কম হওয়ায় তাত্ত্বিকভাবে মাইলেজ কিছুটা কমতে পারে। তবে ২০২৩ সালের এপ্রিলের পর উৎপাদিত মারুতি সুজুকি, হুন্ডাই ও হোন্ডার মতো ব্র্যান্ডের আধুনিক ইঞ্জিনগুলো ইথানল-প্রতিরোধী মেটেরিয়াল দিয়ে তৈরি, যা দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি রোধ করবে। উল্লেখ্য যে, শুধুমাত্র ১০০-অকটেন প্রিমিয়াম পেট্রোল (যেমন XP100 বা Power 100) ইথানল-মুক্ত রাখা হবে।
অটোমোবাইল বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, পুরানো যানবাহনের ক্ষেত্রে আর্দ্রতা জনিত সমস্যা বা ইঞ্জিনের ভেতরের যন্ত্রাংশ ক্ষয়ের ঝুঁকি থাকলেও, সামগ্রিক জাতীয় স্বার্থে এবং পরিবেশ সুরক্ষায় এই রূপান্তর অপরিহার্য। গাড়ি মালিকদের নিয়মিত বিরতিতে ফুয়েল লাইন ও ইঞ্জিন টিউনিং পরীক্ষা করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।



