নয়াদিল্লি | ভিউজ নাউ ডেস্ক
১৯২৯ সাল। ব্রিটিশ শাসনের অন্ধকার সময়। লাহোর জেলে বন্দি তরুণ বিপ্লবী যতীন দাস রাজনৈতিক বন্দিদের মর্যাদার দাবিতে শুরু করেছিলেন ঐতিহাসিক অনশন। অনশন ভাঙাতে ব্রিটিশ সরকার বলপূর্বক নাকে নল ঢুকিয়ে খাবার দেওয়ার চেষ্টা করেছিল বলে ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে। দীর্ঘ ৬৩ দিনের অনশনের পর তাঁর মৃত্যু ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় অধ্যায় হয়ে ওঠে।
প্রায় একশো বছর পরে, ২০২৬ সালে, লাদাখের সমাজকর্মী ও পরিবেশ আন্দোলনের মুখ সোনম ওয়াংচুক শিক্ষা-সংক্রান্ত দুর্নীতির অভিযোগ এবং শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ-সহ বিভিন্ন দাবিতে অনশনে বসেন। টানা ২১ দিনের অনশনের পর তাঁকে দিল্লিতে পুলিশি তৎপরতার মধ্য দিয়ে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। প্রশাসনের দাবি, তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় চিকিৎসার স্বার্থে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, ওয়াংচুকের সমর্থকদের অভিযোগ, তাঁর সম্মতি ছাড়াই অনশনে হস্তক্ষেপ করা হয়েছে এবং আলোচনার পরিবর্তে প্রশাসনিক শক্তি প্রয়োগ করা হয়েছে।
এই ঘটনাকে ঘিরে নতুন করে সামনে এসেছে রাষ্ট্র, প্রতিবাদ এবং গণতন্ত্র নিয়ে বিতর্ক। সমালোচকদের প্রশ্ন, একজন অনশনরত আন্দোলনকারীর সঙ্গে আলোচনার পথ না বেছে যদি প্রশাসনিক হস্তক্ষেপই প্রধান হয়ে ওঠে, তবে তা গণতান্ত্রিক চর্চার জন্য কী বার্তা বহন করে?
ইতিহাসবিদদের একাংশ মনে করিয়ে দিচ্ছেন, ঔপনিবেশিক শাসন এবং স্বাধীন ভারতের সাংবিধানিক কাঠামো এক নয়। তবুও অনশনরত আন্দোলনকারীর প্রতি রাষ্ট্রের আচরণ নিয়ে তুলনা টানা অস্বাভাবিক নয় বলেও মত প্রকাশ করছেন অনেকে। তাঁদের মতে, ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি সবসময় একই রূপে ঘটে না, কিন্তু কিছু দৃশ্য মানুষকে অতীতের স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়।
সোনম ওয়াংচুকের সমর্থকদের অভিযোগ, দাবিগুলি নিয়ে অর্থবহ আলোচনার বদলে প্রশাসনিক পদক্ষেপই বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। তাঁদের বক্তব্য, গণতন্ত্রে ভিন্নমত ও অহিংস প্রতিবাদের প্রতি সরকারের সংবেদনশীল হওয়া উচিত।
প্রতিবাদের ভাষা বদলায়, সময় বদলায়, সরকার বদলায়। কিন্তু রাষ্ট্র ও প্রতিবাদের সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন যেন বারবার ফিরে আসে। সেই কারণেই অনেকের কাছে আজকের এই ঘটনাপ্রবাহ ইতিহাসের এক পুরনো অধ্যায়ের স্মৃতি উসকে দিচ্ছে।
যতীন দাসের আত্মত্যাগ ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতীক হয়ে আছে। আর সোনম ওয়াংচুকের ঘটনাকে ঘিরে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা গণতন্ত্রে প্রতিবাদের অধিকার, রাষ্ট্রের ভূমিকা এবং নাগরিক স্বাধীনতা নিয়ে নতুন করে আলোচনার দরজা খুলে দিয়েছে।
সময় বদলায়। শাসক বদলায়। কিন্তু ইতিহাসের প্রশ্নগুলো বারবার ফিরে আসে—রাষ্ট্র কি প্রতিবাদের ভাষা শুনবে, নাকি তাকে নিয়ন্ত্রণের পথই বেছে নেবে?


