নিজস্ব প্রতিবেদক:
বলিউড ও পাঞ্জাবি ইন্ডাস্ট্রির সুপারস্টার দিলজিৎ দোসাঞ্জ অভিনীত বহু প্রতীক্ষিত ছবি 'সতলেজ' (Satluj) নিয়ে উত্তপ্ত ভারতের চলচ্চিত্র অঙ্গন। দীর্ঘ আইনি লড়াই শেষে ছবিটি ওটিটি প্ল্যাটফর্ম জি-ফাইভ (ZEE5)-এ মুক্তি পেলেও, ভারতে এর প্রদর্শন হঠাৎ করেই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। মুক্তির পরপরই ছবিটি সরিয়ে নেওয়ার ঘটনাটি সিনেমা প্রেমী এবং রাজনৈতিক মহলে বড় ধরণের প্রশ্ন তৈরি করেছে। কেন এই ছবি নিয়ে এত বিতর্ক, আর কী ছিল এর পেছনের কারণ, তা নিয়ে নিচে একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন দেওয়া হলো।
ছবির প্রেক্ষাপট ও মূল বিষয়বস্তু
এই চলচ্চিত্রটি মূলত পাঞ্জাবের এক অন্ধকার সময়ের ওপর ভিত্তি করে নির্মিত একটি সত্য ঘটনা অবলম্বনে মানবধিকার নাট্য (Human Rights Drama)। ছবিতে নাম ভূমিকায় অভিনয় করেছেন দিলজিৎ দোসাঞ্জ। তিনি প্রয়াত মানবাধিকার কর্মী যশবন্ত সিং খালড়া-র চরিত্রে অভিনয় করেছেন।
যশবন্ত সিং খালড়া পাঞ্জাবের সেই অস্থির সময়ে নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধানে এবং পুলিশের হাতে কথিত ভুয়া এনকাউন্টার ও অবৈধভাবে দেহ দাহ করার মতো নৃশংস ঘটনাগুলো জনসমক্ষে আনার জন্য পরিচিত। ছবিটির মূল লক্ষ্যই ছিল ওই সময়কার পুলিশি নৃশংসতা এবং সত্য উন্মোচনের সংগ্রামের ইতিহাস তুলে ধরা।
কেন সেন্সর বোর্ডের সাথে সংঘাত?
'সতলেজ' কেবল একটি সিনেমা নয়, এটি একটি দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের দলিল। ছবিটির মুক্তি আটকে থাকার প্রধান কারণগুলো হলো:
১০০টিরও বেশি কাটছাঁট: সেন্ট্রাল বোর্ড অফ ফিল্ম সার্টিফিকেশন (CBFC) ছবিটির চিত্রনাট্য এবং দৃশ্যায়ন নিয়ে ঘোরতর আপত্তি জানিয়েছিল। বোর্ড কর্তৃপক্ষ ছবিটিতে ১০০টিরও বেশি পরিবর্তনের নির্দেশ দেয়। এর মধ্যে প্রধান ছিল ছবির নাম পরিবর্তন এবং সেই সময়কার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও পাঞ্জাবের বাস্তব ঘটনাগুলোর সরাসরি উল্লেখ বাদ দেওয়া।
নির্মাতাদের আপসহীন অবস্থান: ছবির নির্মাতারা মনে করেছিলেন, বোর্ডের এই ব্যাপক পরিবর্তনগুলো ছবির মূল সুর এবং ঐতিহাসিক সত্যতা নষ্ট করবে। ফলে তাঁরা দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে সেন্সর বোর্ডের সাথে আইনি লড়াই চালিয়ে যান। তাঁরা ছবির মূল মেসেজ বজায় রাখার জন্য আপস করতে অস্বীকার করেন।
ওটিটি মুক্তি ও ভারতীয় সংস্করণে নিষেধাজ্ঞা
দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর গত ৩ জুলাই ছবিটি বিশ্বজুড়ে ওটিটি প্ল্যাটফর্ম জি-ফাইভ-এ মুক্তি পায়। কিন্তু ভারতীয় দর্শকদের জন্য ছবিটি মুক্তি পাওয়ার খুব অল্প সময়ের মধ্যেই এটি ভারত থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। যদিও জি-ফাইভ কর্তৃপক্ষ বা সেন্সর বোর্ড থেকে এই সরিয়ে নেওয়ার কারণ সম্পর্কে কোনো সুনির্দিষ্ট প্রেস বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়নি, তবে এটি স্পষ্ট যে, ভারতের সেন্সরশিপ আইন এবং সংবেদনশীল রাজনৈতিক বিষয়বস্তুই এই সিদ্ধান্তের মূল কারণ।
রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্ক
এই ছবির মুক্তি এবং পরবর্তী নিষেধাজ্ঞা নিয়ে পাঞ্জাবসহ ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক:
১. স্বাধীনতার পক্ষে: অনেকে মনে করেন, ঐতিহাসিক সত্য ঘটনা নিয়ে নির্মিত সিনেমা আটকানো সৃজনশীল স্বাধীনতার পরিপন্থী। তাঁদের মতে, খালড়ার লড়াইয়ের গল্পটি মানুষের জানা উচিত।
২. নিরাপত্তার প্রশ্নে: অন্যদিকে, অনেকে মনে করেন যে, অত্যন্ত স্পর্শকাতর রাজনৈতিক বিষয়ে নির্মিত এই ছবি সমাজে অস্থিরতা বা পুরোনো ক্ষত পুনরুজ্জীবিত করতে পারে, যা জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে সেন্সর করা প্রয়োজন।
'সতলেজ' ছবিটি বর্তমানে বিশ্বজুড়ে উপলব্ধ হলেও ভারতে এটি না দেখা যাওয়ার বিষয়টি প্রমাণ করে যে, শিল্পের স্বাধীনতা এবং রাজনৈতিক সংবেদনশীলতার ভারসাম্য রক্ষা করা কতটা চ্যালেঞ্জিং। দিলজিৎ দোসাঞ্জের ক্যারিয়ারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই প্রজেক্টটি এখন কেবল একটি সিনেমার চেয়ে বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে—এটি এখন সেন্সরশিপ বনাম মত প্রকাশের স্বাধীনতার এক প্রতীক হয়ে উঠেছে।


