*আমরা ভুলে গেছি! কিন্তু কেউ তো মনে রেখেছে.......।।*
■■ একদিন ভোরে, হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেলো।
অগত্যা দাদুর কাছে ছুটলাম
সকাল ৭টা বেজে ১৫
রেডিও তে দুবার থাপ্পড় মারতেই
আকাশবাণী কোলকাতা
খবর পড়ছি.....
বিশেষ বিশেষ (খবরের চার নং) খবর
গতকাল সন্ধ্যেই জঙ্গলমহলে আবারও দুষ্কৃতীদের হাতে নিহত হয়েছেন গোয়ালতোড়ের এক সি পি আই এম নেতা...মাওবাদীদের হাতে খুন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
এভাবেই!
এভাবেই !!
এভাবেই আঁতকে ওঠা প্রতিদিনের খবরের শব্দে,খবরের পাতায়- রাস্তার বাঁক মোড়ে ,গ্রামের মাথায়, চাপ চাপ রক্তে, লাশ গুলো পিছমোড়া করে, পড়ে থাকতো......
আমরা ভুলে গেছি!কিন্তু কেউ তো মনে রেখেছে.....
'মাও ফাও নেই'
বক্তৃতাটা।
অবরুদ্ধ জঙ্গলে পাড়ায় পাড়ায় মোটর সাইকেলে কাঁধে হাত রেখে সেদিনের রোমান্টিকতায় মেতে উঠার ঘটনা গুলো।
লালগড়ের ওই পাড়ায় খাঁটিয়ায় বসে 'ফিসফিসানি'
আজ আমরা ভুলে গেছি ! কিন্তু কেউ তো মনে রেখেছে.....
আজ আমরা ভুলেই গেছি....
শহরে, চোখ কচলাতে কচলাতে ভোরের দরজা খুলেই সবাই খুঁজতাম প্রতিটা সংবাদপত্রে লাশ খোঁজার কাহিনী। সি পি এম এর লাশ। গুলিতে ঝাঁঝরা গলাকাটা লাশ, পিছমোড়া লাশ,মাথা খুবলে যাওয়া লাশ, চাপ চাপ রক্তে ভেজা লাশ।
শহুরে পাড়ার চা দোকানের ঠেকে গল্প শুরু হতো আজ একটা সিপিএম মরেছে।আজ তিনটে সি পি এম মরেছে। আজ লালকালিতে উমুক এর নামে পোস্টার পড়েছে 'শ্রেণী শত্রু' বলে।
আমরা সব ভুলে গেছি! কিন্তু কেউ তো মনে রেখেছে.......
সেদিন
২৮ নভেম্বর, ২০০১ বেলপাহাড়ির সি পি আই এম নেতা সুধীর সিং সর্দারকে তাঁর গ্রামের বাড়ি বাঁশপাহাড়িতে খুন।
৩১ ডিসেম্বর ২০০৫ ,শীতের রাত। বান্দোয়ানে খড়ের চালের চিলেকোঠায় ঘুমোচ্ছিলেন পুরুলিয়ার জেলা পরিষদের সভাধিপতি রবীন্দ্রনাথ কর ও তার স্ত্রী আনন্দময়ী কর। কেরোসিন ঢেলে আগুনে ছাই হয়েছিলো ওই চিলেকোঠা আর জ্যান্ত দুটো মানুষ। রবীন্দ্রনাথ কর বান্দোয়ানের জনপ্রিয় সি পি আই এম এর নেতা ছিলেন।
১৩ জানুয়ারি ২০০৬ বেলাপাহাড়ির দুই যুব নেতা আকাশ বেজ, তাপস মন্ডল সাঁঝের বেলায় বাড়ি ফিরছিলো।জ্যান্ত ফিরতে পারেনি। লাশ হয়ে ফিরেছিলো বাড়িতে।
১৪জুন ২০০৬, সন্ধেবেলা বেলপাহাড়ি বাজারে গল্প করছিলেন রবি দাস। সেখানেই, সেখানেই তাঁর লাশ ফেলে দেয় ছত্রধর বাহিনী।
১৯ সেপ্টেম্বর ২০০৬ বাসে করে বাড়ি ফিরছিলেন শিলদার সি পি আই এম নেতা অনিল মাহাতো। বাস থেকে নামিয়ে রাস্তার মধ্যেই তাঁকে খুন করে ওরা।
আজ আমরা সব ভুলে গেছি!কিন্তু কেউ তো মনে রেখেছে.....
১৫ই জুন ২০০৮ ,গোয়ালতোড়ের কাদশোলে গ্রীষ্মের সন্ধ্যায় মাড় ভাত আর পিঁয়াজের কামড় দিয়ে খাঁটিয়ায় বিশ্রামে গামছা কাঁধে 'গা' এলিয়ে একটু বাতাসের খোঁজ নিতে বসেছিলেন। হঠাৎ অন্ধকারে গুলি বুকের উপর। লুটিয়ে পড়েছিলো জেলা কৃষক সভার নেতা বিশ্বনাথ মান্ডির দেহটা।
১ফেব্রুয়ারি ২০০৯, বিনপুরের মুড়ার গ্রামে মায়ের অন্ত্যেষ্টি করতে ধান জমি বেয়ে খালে গিয়েছিলেন। ভিজে ধুতি আর গামছা কাঁধে আল বেয়ে ছুটিয়ে ছুটিয়ে গুলি বিদ্ধ করেছিলো বিনপুরের সি পি আই এম নেতা নন্দদুলাল পালকে।
১৩ফেব্রুয়ারি ২০০৯ ধরমপুরে বাড়ির দাওয়ায় বসে চার জন তাস খেলছিলো ।DYFIধরমপুর লোকাল কমিটির সম্পাদক, এলাকার জনপ্রিয় যুব নেতা সুজিত পান্ডার তল পেটে গুলি লাগলো হঠাৎই। হাঁপাচ্ছে তবুও বলতে চাইছে কিছু। মেদিনীপুর হাসপাতালে বন্ধ হয়ে গেলো সব কথা বলা।
আমরা ভুলে গেছি! কিন্তু কেউ তো মনে রেখেছে.....
১১জুন ২০০৯ ধরমপুর পার্টি অফিসের আম গাছের নিচে খুন করে ফেলে যাওয়া সি পি আই এম কর্মী শালকু সরেনের লাশটা। পচেছে।পোকা ধরেছে। বৃদ্ধা মা ছিতামনি শুধু কেঁদেছে ,তবুও দেখতে পায়নি।
১৭জুন ২০০৯ অভিজিৎ মাহাতো। এস এফ আই ঝাড়গ্রাম গ্রামীণ জোনাল কমিটির সদস্য। মানিকপাড়া কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র।
ছাত্রসংসদের সাংস্কৃতিক সম্পাদক। দর্শন পাশের পরীক্ষা, খড়্গপুর কলেজে সিট পড়েছে।
না সেদিন তার কলেজে গিয়ে পরীক্ষা দেওয়া হয়নি। আর কোন দিন সে কলেজ যায় নি। রাত পাহারা দিয়ে ঢুলু ঢুলু চোখ। হঠাৎ জঙ্গল থেকে বেরিয়ে প্রথম বুলেটটি বিদ্ধ করে রাস্তার পাশে চায়ের দোকানে বসে থাকা ব্রাঞ্চ সম্পাদক অনিল মাহাতকে।তার পর যুব নেতা নীলাদ্রি মাহাত কে। অভিজিত হত্যাকারীর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়। একটি বুলেট তার পায়ে লাগে। মাটিতে লুটিয়ে পড়ে, অভিজিতের মাথা বন্দুকের বাট দিয়ে থেঁৎলে দেয় ছত্রধরের দল। অভিজিতের দেহ মাটিতেই পড়ে ছিল। লাশ হয়ে গেল ছাত্রটা।
১৭জুন ২০০৯, ঝুজকা আলো ফুটেছে কাকভোরে। পাথরপাড়ায় ঘিরে ধরে সি পি আই এম লোকাল কমিটির সদস্য বাদল আহিরের বাড়িটাকে। তুলে নিয়ে যায় জঙ্গলে । শরীরে শতাধিক পেরেক পুতে জ্যান্ত মানুষটাকে লাশ বানায়।
৩০জুলাই ২০০৯ সন্ধ্যে থেকেই বৃষ্টি। একটু রাত হয়েছে। হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে গেলো।ডাক পড়লো বাড়ি আছো সাগর মাসান্ত। কয়েকজন মিলে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে অকথ্য অত্যাচার। সি পি আই এম আমলাশুলি লোকাল কমিটির সদস্য সাগর মাসান্তের বাঁচতে চাওয়ার আকুতি আর মৃত্যু আগে শেষ চিৎকার শুনেছিল গোটা মাকলী গ্রাম।
২৩সেপ্টেম্বর ২০০৯ বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে হিড়বাঁধে খুন করেছিলো সেদিন।হাড়িমারা গ্রামের ছাগল চরিয়ে সংসার চালানো গরিব পার্টি সমর্থক নিমাই বিশুই এর বুকটা ঝাঁঝরা করে গ্রামের মোড়ে ফেলে দিয়ে যাওয়া কুচকুচে কালো পিচের রাস্তায় চাপ চাপ রক্ত মাখা থ্যাতলানো শরীর টা। ওদিনেই খুন হন ব্যবসায়ী সমীর সিংহ।
আমরা সব ভুলে গেছি !কিন্তু কেউ তো মনে রেখেছে....
১১ডিসেম্বর ২০০৯ দুমড়ে মুচড়ে যাওয়া লাশ টা পাওয়া গেল কাসিজোড়ায়। রনা বেউচার আদিবাসী গরিব বাড়ির ছেলে তিলক টুডু। গড়বেতা কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্র। SFI শালবনী জোনাল কমিটির সদস্য ছিলো।
৪মার্চ ২০১০ বেলপাহাড়ি জোনাল কমিটির DYFI সভাপতি স্বপন মন্ডল খুন হয়ে গেলো। শিলদার জনপ্রিয় ছাত্রযুব নেতাকে খুন করতেই হবে ,অনেকদিনের টার্গেট, প্রত্যাশা পুরন করলো কাঁকো অঞ্চলের খুনিরা।
৪ঠা এপ্রিল ২০১০ পার্থ বিশ্বাস এস এফ আই হাড়দা লোকাল কমিটির সম্পাদক। বিনপুর জোনাল কমিটির সহ সম্পাদক। সন্ধেবেলা নিজের জমি থেকে ফিরে পুকুরে গিয়েছিল; অন দ্য স্পট সেখানেই শেষ পার্থ বিশ্বাস।
২৩ জুন ২০১০ গোয়ালতোড় এর ABPTA নেতা এলাকায় জনপ্রিয় শিক্ষক রঞ্জিত দে। ভালুকবাসা গ্রামের বাসিন্দা।একনিষ্ঠ বামপন্থী সমর্থক। একদিন রাতে কয়েকজন বাড়িতে এসে তুলে নিয়ে যায়। গ্রামের মাথায় কালভার্টের উপর পড়ে থাকে নিথর দেহটা।সকালে গ্রামের লোক দেখলো শিক্ষক রঞ্জিত দে খুন হয়েছে। হাতে থাকা টর্চ লাইট টা তখনও জ্বলছে আর আকাশের দিকে তার আলোর রশ্মি।
২৮ জুন ২০১০ মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী ফুলচাঁদ মাহাত 'শ্রেণী শত্রু'র তালিকায় ঢুকে পড়লো।
২রা আগস্ট ২০১০ মাটি খুঁড়ে জীবন্ত পুতে দেওয়া হলো আই সি ডি এস কর্মী ছবি মাহাত'র ধর্ষিত শরীর টা। জ্যান্ত ছবি মাহাত চিৎকার করতে পারছিলনা। ড্যাব ড্যাব তাকিয়ে ওদের নিশ্চয় বলতে চাইছিলো 'এটা অমানবিক' ।
আমরা সব ভুলে যায়! কিন্তু কেউ তো মনে রেখেছে.......
৫ই সেপ্টেম্বর,২০১০ রবিবার। শিক্ষক দিবসে শালবনি স্কুলে এসেছিলেন মাস্টারমশাই দিবাকর মাহাতো। ছাত্রদের সামনেই দিবাকর মাহাতোকে টেনে হিঁচড়ে বেঁধে নিয়ে যায় ৫০-৬০ জনের দল। স্কুল থেকে ৫০ মিটার দূরে লোধাশুলি ঝাড়গ্রাম হাইওয়ের ওপর পয়েন্ট ব্লাঙ্ক রেঞ্জ থেকে গুলি করে খুন করে দিবাকর মাহাতোকে। দেহের পাশে লিখে দিয়ে গিয়েছিল সি পি আই এম করার অপরাধে খুন করা হল দিবাকর মাহাতোকে। জনণণের বিচার!
২০ সেপ্টেম্বর ২০১০ আগে থেকেই থ্রেট ছিল ফেব্রুয়ারি মাসে ই এফ আর ক্যাম্প যখন আক্রমণ হয় তখন থেকে সিরিয়াস থ্রেট ছিল। শিলদা রাধাচরণ হাইস্কুলে মাওবাদীদের দল ঢুকে অফিস থেকে টেনে বের করে স্কুল ভর্তি ছাত্রদের সামনে স্কুলের কোর্ট ইয়ার্ড এ গুলি করে খুন করে শিলদার জনপ্রিয় সি পি আই এম নেতা ওই স্কুলের করণিক অনন্ত মুখার্জীকে।
২১ নভেম্বর ২০১০ গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান পশুপতি সিং ও পঞ্চায়েত সমিতির সদস্য DYFI শালবনি জোনাল সম্পাদক রোহীন পাতর পঞ্চায়েতের কাজ সেরে ফিরছিলেন মোটর বাইকে করে রাস্তায় গুলি করে খুন করে দুজনকেই।
ভুলে গিয়েছি আমরা!কিন্তু কেউ তো মনে রেখেছে.....
একের পর এক রাস্তা কাটা।
গাছ ফেলে রাস্তা আটকানো।
বাড়িতে বাড়িতে অরন্ধন।
গ্রামবাসীদের বাধ্য জমায়েত করে যৌথবাহিনীর সঙ্গে গুলির লড়াই এ সামনে এগিয়ে দেওয়া।
জোর করে হাজার হাজার টাকা তোলা আদায়।
রাতে পৌঁছে দেওয়া বাড়ির খাবার।
সবই করতো জনসাধারণ কমিটির নেতারা। গ্রাম থেকে গ্রামে তৈরি হয়েছিলো জনসাধারণ কমিটি। তার মুখ্য নেতার নাম ছত্রধর মাহাত।
আমরা সব ভুলে গেছি!কিন্তু কেউ তো মনে রেখেছে....
জ্ঞানেশ্বরী এক্সপ্রেস এর দুর্ঘটনার কথাটা। ট্রেন লাইন কেটে অ্যাক্সিডেন্ট ঘটিয়ে ১৪৮ জনকে খুন করে দেওয়া।
বৃন্দাবনপোল থেকে দুই পুলিশকর্মী কে অপহরন করার কথাটা।
কোলকাতা থেকে জঙ্গলে গিয়ে খাঁটিয়ায় বসে বুদ্ধিজীবীদের গোপন আঁতাত এর বৈঠক গুলোর কথা।
মুখে গামছা নিয়ে পিঠে বন্দুক আর পিছন থেকে ক্যামেরার সামনে মমতা দিদি কে মুখ্যমন্ত্রী দেখতে চাওয়া সেই লোকটাকে।
'জেনগেন' রা কি সব ভুলে যাবে......
আমরা কি সব ভুলেই গেছি! কেউ তো মনে রেখেছে......
'কাজ ফুরালে কাজী কাজের বেলায় কিষেনজি'কে খুন করে স্নো পাউডার মেখে নবান্ন থেকে ফিরে প্রবীর ঘোড়াই এর সঙ্গে মালাবদলের কাহিনীটা(সুচিত্রা মাহাত)।
আমরা সব ভুলেই গেছি !কিন্তু কেউ তো মনে রেখেছে.....
৩৭২ টা লাশ এর মুখ আর......
রক্ত-ঘাম আর মাইলমাইল কান্না গুলো, আতঙ্কের রাতে বাঁচতে চাওয়ার আকুতি গুলো।
সেই কন্যা শিশুটিকে; যার হাতে স্লেটে কাঁপা কাঁপা অক্ষরে লেখা ছিল-"আমার বাবা আর পার্টি করবে না।"
আমরা সব ভুলে যায়!কিন্তু কেউ তো মনে রাখে.....
শিক্ষক উদয় ভানু লোহার কে বাঁচাতে কোন এক মার্শাল এর কথা।
তখন সময় প্রতিদিন খুন হয়ে যাওয়ার খবর গুলো এভাবেই, এভাবেই ........!
জানেন । আমরা, হ্যাঁ আমরা স্বচক্ষে দেখেছি ।
আর শুধুই আতঙ্কে একটার পর একটা দিন এগিয়েছি।আজ সব ভুলে যায়.......
কিন্ত কেউ না কেউ তো মনে রাখবেই......
যার বিভীষিকার রোজনামচা গুলো আজও আগুন হয়ে জ্বলে।
আর কেউ না কেউ মনে রাখবেই .......
ক্ষমতার অলিন্দে পৌঁছাতে এই চিত্রনাট্য তৈরি করেছিল তৃণমূল কংগ্রেস।
আর সেই দিনের সব চিত্রনাট্যের নায়ক ছত্রধর মাহাত,
খুনি ছত্রধর মাহাতো তৃণমূল কংগ্রেস (TMC) দলের রাজ্য নেতা।
প্রসেনজিৎ মুদি
২৫/০৭/২০২১


