দুর্গাপুর, ২১ জুন ২০২৫ : আজ দুর্গাপুরের সাগরভাঙ্গা অঞ্চলে চরকতলায় সিপিআই(এম) দুর্গাপুর পূর্ব এরিয়া কমিটির উদ্যোগে বামফ্রন্ট সরকারের প্রতিষ্ঠা দিবস উপলক্ষে একটি বৃহৎ জনসভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই সমাবেশে হাজারো মানুষের উপস্থিতি সত্ত্বেও প্রাকৃতিক দুর্যোগের ছায়া থাকা সত্ত্বেও এটি একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সিপিআই(এম) নেতা শতরূপ ঘোষ প্রধান বক্তা হিসেবে মঞ্চে উপস্থিত থেকে বামফ্রন্ট সরকারের ৩৪ বছরের ইতিহাস ও বর্তমান রাজ্যের চিত্রের তুলনা করে একটি শক্তিশালী বক্তৃতা রাখেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ১৯৭৭ সালের ২১ জুন থেকে শুরু হওয়া বামফ্রন্টের ৩৪ বছরের সফলতা ও গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় আজও বাংলার জনগণের জন্য একটি পথপ্রদর্শক।
৩৪ বছরের স্মৃতি ও গর্ব
শতরূপ ঘোষ তাঁর বক্তৃতায় ফিরে যান ১৯৭৭ সালে, যখন বামফ্রন্ট সরকার প্রথম ক্ষমতায় এসে বাংলার সমাজে একটি নতুন দিশা তৈরি করে। তিনি বলেন, এই ৩৪ বছরে কৃষক, শ্রমিক ও নারীদের জীবনে যে অধিকার এনে দেওয়া হয়েছিল, তা বাংলার ইতিহাসে একটি স্বর্ণিম অধ্যায় হিসেবে গণ্য হয়। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও শিল্পায়নের মাধ্যমে রাজ্যের উন্নয়ন একসময় বাংলার গর্ব ছিল। তিনি জোর দেন, এই ৩৪ বছরের স্মৃতি বারবার মনে করিয়ে দেওয়া জরুরি, কারণ এটি বাংলার মানুষকে নতুন মুক্তির দিশা দেখাতে পারে।
২০১১-এর পরের পরিবর্তন ও চ্যালেঞ্জ
তবে শতরূপ ঘোষ বর্তমান রাজ্যের চিত্রও তুলে ধরেন। ২০১১ সালের নির্বাচনের পর থেকে বাংলার সমাজে যে পরিবর্তন এসেছে, তা তিনি একটি দুঃখজনক বাস্তবতা হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, কৃষকদের অর্জিত অধিকার ধীরে ধীরে কমে গেছে, এবং এর জায়গায় বিভিন্ন মাফিয়া ও দখলদারির রাজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। একসময় বাম সরকারের গর্ব ছিল নারী নিরাপত্তা, কিন্তু আজ সেই নারী নিরাপত্তার চিত্র তলানিতে গেছে। সাম্প্রতিক আরজিকর ঘটনা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই ঘটনা প্রমাণ করে যে রাজ্যে নারী নিরাপত্তা কতটা দুর্বল হয়ে পড়েছে।
শিল্পায়ন ও শিক্ষার পতন
শতরূপ ঘোষ আরো বলেন, বামফ্রন্ট সরকারের শিল্পায়ন নীতি একসময় বাংলাকে শিল্পের কেন্দ্রে রূপান্তর করেছিল। কিন্তু বর্তমানে এই নীতি ব্যর্থ হওয়ায় রাজ্যে শিল্প প্রতিষ্ঠান স্থাপনের কোন আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না। ফলে বেকার যুবক-যুবতীদের রুটির খোঁজে রাজ্য ছেড়ে যাওয়া বাধ্য হচ্ছে। তিনি সিন্ডিকেট রাজের উল্লেখ করেন, যা শিল্পপতিদের রাজ্যে বিনিয়োগ থেকে দূরে রাখছে।
শিক্ষার মানের পতনও তিনি একটি বড় চিন্তার বিষয় হিসেবে তুলে ধরেন। একসময় বাংলার গর্ব ছিল শিক্ষার মান, কিন্তু আজ কলেজ ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো রাজনৈতিক মারকাটার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। ছাত্র সংসদ নির্বাচনের অনুপস্থিতি ও মাফিয়া রাজের প্রভাবে শিক্ষা প্রায় নিরুদ্দেশ হয়ে যাচ্ছে। তিনি এসএফআইয়ের দাবি উল্লেখ করেন, তবে দীর্ঘদিন ধরে ছাত্র সংসদ নির্বাচন না হওয়ায় শিক্ষা ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
গণতন্ত্রের ধ্বংস ও আগামী লড়াই
শতরূপ ঘোষ নির্বাচনে ভোট লুট ও সন্ত্রাসের চিত্র তুলে ধরেন, যা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে ধ্বংস করছে। তিনি বলেন, তৃণমূল সরকারের দখলদারি রাজনীতি বাংলাকে ধর্মীয় বিভেদ ও দুর্নীতির শিখরে নিয়ে গেছে। এই পরিস্থিতিতে তিনি জোর দেন, জনগণের আন্দোলন ও আগামী নির্বাচন একটি ঐতিহাসিক ঘটনা হিসেবে প্রমাণিত হবে। তিনি বলেন, মাফিয়া ও গুন্ডারাজের বিরুদ্ধে জনগণের রাস্তায় নামা জরুরি, এবং এটি বাংলার মুক্তির পথ তৈরি করবে।
সমাবেশের সফলতা ও ভবিষ্যৎ দিশা
প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যেও হাজারো মানুষের উপস্থিতি সমাবেশকে সফল করেছে। শতরূপ ঘোষ বলেন, বাংলার গর্বের ৩৪ বছর ফিরিয়ে আনতে এই আন্দোলন অভিমুখ তৈরি করবে। তিনি জনগণকে শপথ নিতে আহ্বান জানান যে, এই ৩৪ বছরের ঐতিহ্য বজায় রাখতে এবং বাংলাকে মুক্তির পথে নিয়ে যেতে লড়াই চালিয়ে যাওয়া হবে। সমাবেশে উপস্থিত মানুষের প্রত্যয় ও শক্তি এই লক্ষ্যকে সফল করার প্রতিশ্রুতি দেয়।
এই সমাবেশটি শুধু একটি স্মরণীয় অনুষ্ঠানই নয়, বরং বাংলার ভবিষ্যতের জন্য একটি নতুন আশার দিশা তৈরি করেছে। শতরূপ ঘোষের বক্তৃতা ও জনগণের উৎসাহ বাংলার ঋতু গৌরব ফিরিয়ে আনার লড়াইয়ের শুরু হিসেবে চিহ্নিত হবে।






