" " //psuftoum.com/4/5191039 Live Web Directory ডুরান্ড লাইন: দক্ষিণ এশিয়ার এক 'অমীমাংসিত ক্ষত' ও বর্তমান যুদ্ধের নেপথ্যে //whairtoa.com/4/5181814
Type Here to Get Search Results !

ডুরান্ড লাইন: দক্ষিণ এশিয়ার এক 'অমীমাংসিত ক্ষত' ও বর্তমান যুদ্ধের নেপথ্যে

 


বিশেষ প্রতিবেদন | মার্চ ১৬, ২০২৬

দক্ষিণ এশিয়ার মানচিত্রে একটি রেখা আজ এক শতাব্দী প্রাচীন সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। ডুরান্ড লাইন—আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মধ্যবর্তী প্রায় ২,৬৪০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সীমান্ত এখন কেবল একটি মানচিত্রের দাগ নয়, বরং এটি একটি সক্রিয় যুদ্ধক্ষেত্র। ২০২৫ সালের শেষভাগ থেকে শুরু হওয়া উত্তেজনা ২০২৬ সালের এই সময়ে এসে এক ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।

১. ডুরান্ড লাইনের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: ব্রিটিশ আমলের উত্তরাধিকার

১৮৯৩ সালে ব্রিটিশ ভারতের তৎকালীন পররাষ্ট্র সচিব স্যার হেনরি মর্তিমার ডুরান্ড এবং আফগান আমির আবদুর রহমান খান-এর মধ্যে এক চুক্তির মাধ্যমে এই সীমান্ত রেখা টানা হয়।

  • গ্রেট গেম: ঊনবিংশ শতাব্দীতে ব্রিটিশ ও রুশ সাম্রাজ্যের মধ্যকার প্রতিযোগিতার ফলে আফগানিস্তানকে একটি 'বাফার স্টেট' (Buffer State) হিসেবে ব্যবহার করার জন্য এই রেখাটি তৈরি করা হয়েছিল।

  • বিভক্ত জাতি: এই রেখাটি টানার সময় ভৌগোলিক বা জাতিগত বাস্তবতাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। ফলে এটি পশতুন এবং বালুচ আদিবাসী এলাকাগুলোকে দুই ভাগে বিভক্ত করে দেয়। একদিকের মানুষ ব্রিটিশ ভারতের (বর্তমান পাকিস্তান) এবং অন্যদিকের মানুষ আফগানিস্তানের অংশে পড়ে যায়।

২. কেন আফগানিস্তান এই সীমান্ত মানে না?

১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠনের পর থেকে কোনো আফগান সরকারই—তা সে রাজতন্ত্র হোক, কমিউনিস্ট হোক বা বর্তমান তালেবান—আনুষ্ঠানিকভাবে ডুরান্ড লাইনকে আন্তর্জাতিক সীমান্ত হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি।

  • উপনিবেশিক চাপ: আফগানদের দাবি, ১৮৯৩ সালের সেই চুক্তিটি ব্রিটিশরা আমিরের ওপর চাপিয়ে দিয়েছিল এবং এর মেয়াদ ছিল মাত্র ১০০ বছর (যদিও চুক্তিতে মেয়াদের কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ নেই)।

  • পশতুনিস্তান ইস্যু: আফগানিস্তান মনে করে, পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখোয়া ও বেলুচিস্তানের একাংশ ঐতিহাসিকভাবে আফগানিস্তানের অংশ। এই অঞ্চলের পশতুনদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার বা 'পশতুনিস্তান' গঠনের দাবি কাবুলের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অবস্থান।

৩. ২০২৫-২৬ সালের বর্তমান উত্তেজনা ও যুদ্ধের কারণ

সাম্প্রতিক সময়ে এই সীমান্ত অঞ্চলে উত্তেজনা চরমে ওঠার পেছনে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট কারণ রয়েছে:

  • টিটিপি (TTP) এবং সীমান্ত হামলা: পাকিস্তান দাবি করছে যে, তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (TTP) আফগানিস্তানের মাটিতে আশ্রয় নিয়ে পাকিস্তানে বড় ধরনের নাশকতামূলক হামলা চালাচ্ছে। এর প্রতিবাদে পাকিস্তান গত কয়েক মাসে আফগান ভূখণ্ডে ড্রোন ও বিমান হামলা চালিয়েছে।

  • তালেবানদের পাল্টা আক্রমণ: পাকিস্তান যখন আফগান ভূখণ্ডে হামলা চালায়, তখন কাবুলের তালেবান প্রশাসন একে তাদের সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত হিসেবে দেখে। ফলে ২০২৬ সালের শুরু থেকে তালেবান বাহিনী পাকিস্তানের সীমান্ত পোস্টগুলোতে ভারী অস্ত্র ও কামান নিয়ে হামলা চালাচ্ছে। খবর পাওয়া গেছে যে, বেশ কিছু সীমান্ত চৌকি এখন তালেবানদের দখলে।

  • কাঁটাতারের বেড়া বিতর্ক: পাকিস্তান গত কয়েক বছর ধরে ডুরান্ড লাইনের অধিকাংশ স্থানে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ করেছে। তালেবানরা এই বেড়াকে অবৈধ মনে করে এবং অনেক জায়গায় তারা এই বেড়া উপড়ে ফেলেছে, যা সরাসরি সশস্ত্র সংঘর্ষের সূত্রপাত করেছে।

৪. বর্তমান পরিস্থিতির আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক প্রভাব

এই সংঘাত কেবল দুই দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, এর প্রভাব পুরো অঞ্চলের ওপর পড়ছে:

  • ভারত ও ইরান: পাকিস্তানের পশ্চিম সীমান্তে এই অস্থিরতা ইসলামাবাদের সামরিক শক্তিকে পূর্ব সীমান্ত (ভারত) থেকে সরিয়ে আনতে বাধ্য করছে। এটি ভারতের জন্য কৌশলগতভাবে স্বস্তিদায়ক হলেও এই অঞ্চলের অস্থিতিশীলতা সামগ্রিক নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগের। ইরানও তাদের পূর্ব সীমান্তে শরণার্থী প্রবাহ এবং জঙ্গি অনুপ্রবেশ নিয়ে শঙ্কিত।

  • মানবিক সংকট: কয়েক লাখ আফগান শরণার্থীকে পাকিস্তান থেকে বিতাড়নের ঘোষণা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। সীমান্তে হাজার হাজার ট্রাক আটকে থাকায় খাদ্য ও ওষুধের সংকট দেখা দিয়েছে।

  • বাণিজ্যিক ক্ষতি: তোরখাম ও চামান বর্ডার দিয়ে মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে পাকিস্তানের বাণিজ্য প্রায় বন্ধ হওয়ার পথে। এতে কোটি কোটি ডলারের অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে।

৫. লাভবান হচ্ছে কারা?

বিশ্লেষকদের মতে, এই বিশৃঙ্খলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি লাভবান হচ্ছে আইএস-কে (ISIS-K)-এর মতো আন্তর্জাতিক জঙ্গি গোষ্ঠীগুলো। যখন পাকিস্তান ও তালেবান বাহিনী একে অপরের সঙ্গে যুদ্ধ করছে, তখন এই গোষ্ঠীগুলো তাদের নেটওয়ার্ক বাড়ানোর সুযোগ পাচ্ছে। এছাড়া, পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা সামাল দিতে সেনাবাহিনীর জন্য এই সীমান্ত যুদ্ধ এক ধরনের 'ডাইভারশন' বা মনোযোগ সরানোর কৌশল হিসেবেও দেখা হচ্ছে।


ডুরান্ড লাইন এখন দক্ষিণ এশিয়ার এক বিষফোঁড়া। যতদিন পর্যন্ত একটি স্থায়ী সীমান্ত চুক্তিতে দুই দেশ পৌঁছাতে না পারবে, ততদিন পর্যন্ত এই রক্তক্ষরণ চলতেই থাকবে। ২০২৬ সালের এই সংকট প্রমাণ করছে যে, একশ বছর আগের একটি পেন্সিলের দাগ আজও লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবনকে অনিশ্চয়তায় ফেলে দিতে পারে।

Top Post Ad

Below Post Ad

Hollywood Movies