বাঁধগাবা আন্দোলন: খাদ্যের দাবিতে রক্তঝরা ইতিহাস একাত্তর বছরেরও বেশি সময় পরেও বাঁকুড়ার মাটিতে বাজে কৃষক শহীদদের লড়াইয়ের সুর
কলমে: শংকর পাল
বাঁকুড়ার বিষ্ণুপুর–জয়পুর সড়কে দাঁড়িয়ে আছে একখণ্ড পাথরের স্তম্ভ, যাকে ঘিরে প্রতি বছর ১লা ভাদ্র মানুষ নীরব শ্রদ্ধা জানাতে আসে। বহুজন হয়তো জানেও না, এই স্থানের বুকেই একসময় কৃষকরা বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন খাদ্যের অধিকারের দাবিতে। লাঠি-গুলি, শাসকের হুমকি—কিছুই ভয় দেখাতে পারেনি তাঁদের। ১৯৪৯ সালের সেই আন্দোলনের নামই আজ ইতিহাসের পাতায় লেখা আছে—বাঁধগাবা আন্দোলন।
ইতিহাসের আঙিনায় ফিরে দেখা
চল্লিশ দশকের শেষের দিকটা—বাংলা তখন দুর্ভিক্ষের দগ্ধ স্মৃতি বয়ে বেড়াচ্ছে। ফসল ফললেও কৃষকরা পাচ্ছিলেন না প্রাপ্য অংশ। অন্যদিকে জমিদার-মহাজনদের শোষণে নিঃশেষ হচ্ছিল গ্রামীণ সমাজ। সেই সময়ে জেগে ওঠে কৃষক সভা, আর তাঁরই নেতৃত্বে বাঁকুড়ার কৃষকরা পথে নামে।
১লা ভাদ্র, ১৯৪৯ সালে বাঁধগাবায় ঘটে সেই রক্তাক্ত সংঘর্ষ। পুলিশের গুলিতে শহীদ হন ছয়জন কৃষক। তাদের রক্ত মিশে যায় এই মাটির সঙ্গে। আন্দোলনকারীরা বলেছিলেন—“খাদ্য চাই, ন্যায্য ভাগ চাই।” সেখান থেকেই বাঁধগাবা আন্দোলন হয়ে ওঠে সর্বভারতীয় তেভাগা আন্দোলনের এক অঙ্গ।
শহীদ স্তম্ভ: নীরব সাক্ষী
আজও যাঁরা বিষ্ণুপুর–জয়পুরের পথে চলাচল করেন, তাঁদের চোখে পড়বে সেই শহীদ স্তম্ভটি। সময়ের ধুলো জমলেও তার প্রতিটি ইট যেন সাক্ষী দিচ্ছে—এই মাটির মানুষ শুধু চাষ করতে জানে না, অধিকার রক্ষার জন্য প্রাণ দিতেও পিছপা হয় না।
কমরেড অমিয় পাত্র বলছিলেন,
“এই শহীদ স্তম্ভ কৃষকের রক্ত, ঘাম আর আত্মত্যাগের দলিল। ইতিহাস মুছে দেওয়া যায় না। এই স্মারক মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে বাংলার কৃষক সংগ্রামের প্রতীক হয়ে।”
আজকের প্রেক্ষাপটে বাঁধগাবার বার্তা
বাংলার কৃষকের লড়াই আজও শেষ হয়নি। খাদ্য নিরাপত্তা, কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য, কৃষি–ঋণের বোঝা, ফসল রক্ষায় সরকারি অবহেলা—সবকিছুর বিরুদ্ধে আজও বারবার আন্দোলনে নামছেন কৃষকরা।
শহীদ দিবসের বক্তৃতায় এক কৃষক নেতা বলেন,
“যে রক্ত ১৯৪৯ সালে ঝরেছিল, তার শিক্ষা আমাদের বর্তমান সংগ্রামের শক্তি জোগায়। বাঁধগাবা শুধু ইতিহাস নয়, এটি বর্তমানও।”
বাঁকুড়ার বাঁধগাবা আন্দোলন আজ আর শুধু ইতিহাস নয়, এটি হয়ে উঠেছে প্রতিটি প্রজন্মের কাছে এক চিরন্তন শিক্ষা। সাহসী কৃষকরা দেখিয়ে দিয়েছিলেন—খাদ্য ও অধিকারের দাবি কখনও নতজানু হয় না। শহীদদের রক্তে লেখা সেই বার্তা আজও শোনায়—“সংগ্রাম ছাড়া মুক্তি নেই।”



