পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চল উত্তর ২৪ পরগণা। এক সময় এই জেলা ছিল কর্মচঞ্চল, যেখানে অসংখ্য পাটকল, বস্ত্র কারখানা, ও অন্যান্য শিল্প প্রতিষ্ঠানে হাজার হাজার শ্রমিক কাজ করতেন। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই চিত্র আমূল বদলে গেছে। বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানা, বেকারত্বের অভিশাপ, এবং শ্রমিকদের জীবন-জীবিকার চরম সংকট এই জেলার এক নতুন বাস্তবতা। এই পরিস্থিতিতে, সিআইটিইউ (সেন্টার অফ ইন্ডিয়ান ট্রেড ইউনিয়নস) উত্তর ২৪ পরগণা জেলা কমিটির ডাকে পানিহাটি ট্রাফিক মোড়ে অনুষ্ঠিত হলো এক ঐতিহাসিক প্রকাশ্য কনভেনশন। "শিল্পের জমিতে শিল্প চাই, কাজ চাই" – এই স্লোগানকে সামনে রেখে শ্রমিকরা তাঁদের দীর্ঘদিনের দাবি নিয়ে পথে নেমেছেন। এই কনভেনশন শুধু একটি প্রতিবাদ নয়, বরং এই জেলার শিল্প ও শ্রমিক সমাজের বর্তমান দুর্দশার এক জ্বলন্ত দলিল।
উত্তর ২৪ পরগণার শিল্প অর্থনীতির গতিপ্রকৃতি:
উত্তর ২৪ পরগণা জেলার শিল্প ইতিহাস অত্যন্ত সমৃদ্ধ। এখানে প্রায় ১১,০০০-এর বেশি ক্ষুদ্র শিল্প (SSI) ইউনিট রয়েছে, যা অসংখ্য মানুষকে কর্মসংস্থান দেয়। বিশেষত, পাট শিল্প এই জেলার অর্থনীতির মেরুদণ্ড। এখানে প্রায় ৭৫টি সরকারি নিবন্ধিত পাটভিত্তিক কারখানা রয়েছে, যেখানে প্রায় ৬০,০০০ শ্রমিক সরাসরি যুক্ত। এছাড়া খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, হস্তশিল্প, বস্ত্র, অটো পার্টস, ইলেকট্রনিক্স, রত্ন ও গয়না, চামড়া, কাচ, এবং ওষুধ শিল্প এই জেলার অর্থনৈতিক ভিত্তি মজবুত করেছে। দীর্ঘকাল ধরে এই কারখানাগুলি জেলার সামগ্রিক আর্থিক বৃদ্ধিতে বিশাল ভূমিকা রেখেছে।
বন্ধ কারখানার অভিশাপ ও শ্রমিকদের দুর্দশা:
দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এই সমৃদ্ধ অতীত আজ এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখোমুখি। বিশ্বায়ন ও প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের এই যুগে, বহু পুরোনো কারখানা, বিশেষত পাটকলগুলো, একের পর এক বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এর ফলে হাজার হাজার শ্রমিক কাজ হারিয়ে বেকার হয়ে পড়েছেন। একটি প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, শুধুমাত্র উত্তর ২৪ পরগণায় প্রায় ৬৫,০০০ জন শ্রমিক এভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। নাইহাটি জুট মিল বন্ধ হওয়ায় প্রায় ৪,০০০ শ্রমিক কাজ হারিয়েছেন, যা এক একটি পরিবারের জন্য এক বিশাল আঘাত।
শ্রমিকদের এই দুর্দশা কেবল পরিসংখ্যান নয়, বরং তাদের প্রতিদিনের জীবন-সংগ্রাম। মাসের শেষে বেতন নেই, ছেলে-মেয়েদের পড়াশোনার খরচ চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে, অসুস্থ হলে চিকিৎসার খরচ জোগানো অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। বন্ধ কারখানার শ্রমিক পরিবারগুলো চরম অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছেন, অনেকেই বাধ্য হয়ে ছোটখাটো ব্যবসা বা দিনমজুরের কাজ করছেন। পরিবারের নারী সদস্যরাও কোনোমতে সংসারের হাল ধরতে ছোটখাটো কাজ বা টিউশনি করছেন। এই পরিস্থিতি শিক্ষিত যুবক-যুবতীদের মধ্যেও হতাশা সৃষ্টি করছে, কারণ কর্মসংস্থানের সুযোগ খুবই সীমিত।
সিআইটিইউ-এর কনভেনশন: এক বলিষ্ঠ প্রতিবাদ:
এই প্রেক্ষাপটে, সিআইটিইউ উত্তর ২৪ পরগণার শ্রমিকদের দুর্দশার বিরুদ্ধে এক বলিষ্ঠ প্রতিবাদ হিসেবে পানিহাটি ট্রাফিক মোড়ে এই কনভেনশনের আয়োজন করে। কনভেনশনে জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার শ্রমিক ও সাধারণ মানুষ উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের মুখে ছিল একটাই দাবি – বন্ধ কারখানার অব্যবহৃত জমিতে নতুন করে শিল্প স্থাপন করে কর্মসংস্থান তৈরি করতে হবে।
কনভেনশনের প্রধান বক্তারা ছিলেন শ্রমিক নেতা কমরেড আভাস রায় চৌধুরী, কমরেড সুরজিৎ বসু, কমরেড গার্গী চ্যাটার্জী, কমরেড জহর ঘোষাল এবং কমরেড অনির্বাণ ভট্টাচার্য। তাঁদের বক্তব্যে এই অঞ্চলের শিল্প ও শ্রমিকদের বর্তমান সংকটের প্রতিটি দিক উঠে আসে। কমরেড আভাস রায় চৌধুরী তাঁর বক্তৃতায় বলেন, "এই জমিগুলো শুধু একটি কারখানা নয়, হাজার হাজার শ্রমিকের স্বপ্ন ও জীবিকা। সরকার যদি এই জমিগুলিকে সঠিকভাবে ব্যবহার না করে, তবে আমাদের আন্দোলন আরও শক্তিশালী হবে।"
কমরেড সুরজিৎ বসু বলেন, "শ্রমিকরা আর বেকার থাকতে চান না। তাঁরা কাজ চান, শিল্প চান। আমরা এই আন্দোলনকে শুধু একটি কনভেনশনে সীমাবদ্ধ রাখব না, বরং এটি একটি বৃহত্তর আন্দোলনের সূচনা।"
ভবিষ্যতের পথ ও প্রত্যাশা:
সরকার যদিও নতুন শিল্পায়নের কিছু উদ্যোগ নিয়েছে, যেমন নাইহাটি অঞ্চলে "রিষি বঙ্কিম শিল্পউদ্যান" (ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক) তৈরি, শ্রমিক সংগঠনগুলোর মতে তা যথেষ্ট নয়। এই পার্কটি পরিবেশবান্ধব শিল্প স্থাপনের জন্য তৈরি হচ্ছে এবং এখানে ভালো বিনিয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে শ্রমিকদের দাবি, এই ধরনের প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে এবং বন্ধ কারখানার পুরোনো শ্রমিকদের সেখানে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে।
এই কনভেনশনের মাধ্যমে সিআইটিইউ কেবল একটি দাবি জানায়নি, বরং উত্তর ২৪ পরগণার শিল্প ও শ্রমিক সমাজের এক দীর্ঘদিনের হতাশা ও স্বপ্নকে তুলে ধরেছে। এটি এক নতুন আন্দোলনের সূচনা, যেখানে শ্রমিকরা কেবল নিজেদের অধিকারের জন্য নয়, বরং একটি সমৃদ্ধ এবং কর্মচঞ্চল জেলার ভবিষ্যতের জন্য লড়াই করছেন। এই লড়াই সফল হলে, উত্তর ২৪ পরগণার শিল্প মানচিত্রে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হবে।




