দুর্গাপুর : সময়ের চাকা ঘুরে চলে অবিরাম। শতবর্ষ পার হয়ে যায়, কিন্তু কিছু নাম, কিছু সুর, কিছু কবিতা আজও আমাদের প্রাণে গভীর দাগ কেটে যায়। দুর্গাপুরের মাটিতে তেমনই এক সন্ধ্যা নেমে এসেছিল, যা ছিল শুধু একটি অনুষ্ঠান নয়, বরং এক আবেগঘন শ্রদ্ধাঞ্জলি। যেখানে এক মঞ্চে মিলিত হয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, সুকান্ত ভট্টাচার্য এবং আমাদের গণমানুষের প্রিয় শিল্পী সলিল চৌধুরী। দুর্গাপুরের দেশবন্ধু ভবন-এর প্রতিটি ইঁট যেন সেদিন সাক্ষী ছিল বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির এই চার দিকপালকে স্মরণ করার।
এই আবেগময় সন্ধ্যাটির আয়োজন করেছিল ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী)-র দুর্গাপুর ইস্পাত ১ এরিয়া কমিটি। তাদের ডাকে সাড়া দিয়ে যেন গোটা দুর্গাপুর শহর সেদিন একত্রিত হয়েছিল। অনুষ্ঠান শুরু হয়েছিল সন্ধ্যা ৬টায়, যখন দিনের আলো ম্লান হয়ে আসছিল এবং মঞ্চের আলোয় উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল শ্রদ্ধার এক ভিন্ন মাত্রা। প্রথমেই শিল্পী সোমনাথ ব্যানার্জির কণ্ঠে ধ্বনিত হলো সংগীত। সেই সুর যেন শুধু একটি গান ছিল না, ছিল অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যতের প্রতি এক অকৃত্রিম অঙ্গীকার। এরিয়া সম্পাদক পূজন চক্রবর্তী উদ্বোধনী ভাষণের মধ্যে শিল্পীদের শৈল্পিক মেলবন্ধন রচনা করেন।এছাড়াও বক্তব্য রাখেন পশ্চিম বর্ধমান জেলা সম্পাদক মন্ডলীর পক্ষ থেকে পার্থ মুখার্জি।
অনুষ্ঠানের পরবর্তী অংশে ছিল সেই মুহূর্ত, যা আমাদের মনকে বিষণ্ণ করে তোলে। মঞ্চে রাখা হয়েছিল চার কালজয়ী ব্যক্তিত্বের প্রতিমূর্তি। সেই প্রতিমূর্তির সামনে ফুল এবং প্রদীপ জ্বালিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হলো। ফুল দিয়ে স্রোধ জানালেন সন্তোষ দেবরায় ,পার্থ মুখার্জি,বিশ্বরূপ বন্দোপাধ্যায়। সেই শ্রদ্ধা নিবেদনের প্রতিটি মুহূর্তে যেন মনে হচ্ছিল, তাঁরা আমাদের মাঝে সশরীরে উপস্থিত আছেন। সেই প্রদীপগুলো শুধু প্রদীপ ছিল না, ছিল চার অমর আত্মার প্রতি শ্রদ্ধার শিখা। তাঁদের নীরব উপস্থিতি আর শ্রদ্ধার ভঙ্গিতে ফুটে উঠেছিল এক গভীর ভালোবাসা। এরপরই পরিবেশিত হলো উদ্বোধনী সঙ্গীত, যা পরিবেশন করে 'ভারতীয় গণনাট্য সংঘ', দুর্গাপুর ইস্পাত শাখা। তাদের কণ্ঠে সেই গান যেন ইতিহাসের পাতা থেকে তুলে আনা এক বেদনার্ত সুর।
দ্বিতীয় পর্বটি ছিল যেন আমাদের হৃদয়ের গভীর থেকে উঠে আসা এক ভালোবাসার প্রতিচ্ছবি। সেখানে গান, আবৃত্তি আর নৃত্যের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছিল চার মহাজনের সৃষ্টি। 'গণনাট্য সংঘ'-এর সমবেত সঙ্গীত, যা ছিল ‘গণনাট্য সংঘ’ এবং ‘মুক্তমন্দির’-এর মিলিত প্রয়াস। তাদের সুরে ছিল মানুষের সংগ্রামের ইতিহাস। 'লহরী'-র শিল্পীরাও তাঁদের গানের মাধ্যমে যেন আমাদের জীবনের লড়াইকে নতুন করে চিনিয়ে দিল। একক আবৃত্তি পরিবেশন করে ‘ছন্দনীড়’-এর সাংস্কৃতিক শাখা। তাদের আবৃত্তিতে ছিল যেন শব্দের কারুকাজ, যা আমাদের মনকে স্পর্শ করে যায়। আর একক নৃত্যে শ্রীমতী প্রামাণিক-এর প্রতিটি পদক্ষেপে ছিল এক নীরব অভিব্যক্তি, যা ভাষা ছাড়াই অনেক কিছু বলে যায়। সবশেষে, যখন অর্ণব চট্টোপাধ্যায় তাঁর একক সঙ্গীত পরিবেশন করলেন, তখন মনে হলো তাঁর কণ্ঠ যেন চার কালজয়ী শিল্পীর কণ্ঠের প্রতিধ্বনি।
অনুষ্ঠানের ছিল 'বসে আঁকো প্রতিযোগিতা'-র বিজয়ীদের পুরষ্কার বিতরণ। সেইসব খুদে শিল্পীদের হাতে যখন পুরষ্কার তুলে দেওয়া হচ্ছিল, তখন মনে হচ্ছিল, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যেন এই চার মহাজনের স্বপ্নকে নতুন করে আঁকছে। এই পুরষ্কার ছিল শুধু একটি পুরস্কার নয়, ছিল ভবিষ্যতের প্রতি এক আশার আলো। প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থানে ছিলেন যথাক্রমে রাজল্যা ঘোষাল, প্রিয়ম ভট্টাচার্য ও সিঞ্চিকা গাটাওয়াড়ি (বিভাগ-ক) এবং ভূমিজা সিংহ, শিল্পী দাসগুপ্ত ও অনুজ্ঞা কর্মকার (বিভাগ-খ)। ভালোবাসা আর শ্রদ্ধার এই বন্ধন কোনোদিন শেষ হয় না।
সন্ধ্যাটি শেষ হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু এর রেশ রয়ে গিয়েছিল সকলের মনে। এটি শুধু একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ছিল না, ছিল আমাদের শেকড়ের প্রতি ফিরে যাওয়ার একটি প্রচেষ্টা। যেখানে রবীন্দ্র-নজরুল-সুকান্ত-সলিলের সৃষ্টি আমাদের নতুন করে বাঁচতে শিখিয়েছে।
























