মার্কিন তরুণ উদ্ভাবক জুলিয়ান ব্রাউন তার আবিষ্কার প্লাস্টোলিন দিয়ে বিশ্বব্যাপী নজর কেড়েছেন। তিনি দাবি করেন, এই যন্ত্রটি প্লাস্টিক বর্জ্যকে পেট্রোল, ডিজেল এবং জেট ফুয়েলের মতো ব্যবহারযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তর করতে পারে। মাইক্রোওয়েভ পাইরোলাইসিস নামক একটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এই যন্ত্রটি প্লাস্টিক দূষণ মোকাবিলায় একটি বিপ্লবী সমাধান হিসেবে প্রশংসিত হলেও, এর নিরাপত্তা এবং পরিবেশগত দাবি নিয়ে বৈজ্ঞানিক মহলে তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে।
প্লাস্টোলিন-এর প্রযুক্তি: সৌরশক্তি-চালিত ব্লাস্টিক থেকে জ্বালানি
প্লাস্টোলিনকে একটি সৌরশক্তি-চালিত চুল্লি (solar-powered reactor) হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, যা অক্সিজেনের অনুপস্থিতিতে প্লাস্টিক ভাঙতে নিরবচ্ছিন্ন মাইক্রোওয়েভ পাইরোলাইসিস ব্যবহার করে। এই প্রক্রিয়ায় তরল জ্বালানি তৈরি হয়, যা এটিকে প্রচলিত পুনর্ব্যবহার পদ্ধতি থেকে আলাদা করে।
তরুণ বয়সে মৌলিক ঢালাই জ্ঞান নিয়ে শুরু করে, ব্রাউন পাঁচ বছর ধরে প্রায় একাই এই প্রযুক্তি তৈরি ও উন্নত করেছেন। তার কোম্পানি, নেচারজ্যাব (পরবর্তীতে জ্যাব’স পাইরোলাইসিস অ্যান্ড এনার্জি রিকভারি), তার এই আবিষ্কারের প্ল্যাটফর্ম। ব্রাউনের মতে, সৌরশক্তি ব্যবহার করে তার বাড়ির পেছনের উঠোনে এই প্রক্রিয়াটি চালানো সম্ভব, যা প্লাস্টিক বর্জ্য থেকে শক্তি পুনরুদ্ধারের একটি আরও টেকসই উপায়।
বৈজ্ঞানিক সন্দেহ এবং দূষণের উদ্বেগ
ব্রাউনের দাবি সত্ত্বেও, তার উদ্ভাবনটি বিজ্ঞানীদের কাছ থেকে যথেষ্ট সন্দেহের সম্মুখীন হয়েছে। যদিও স্বাধীন ল্যাব পরীক্ষা অনুসারে প্লাস্টোলিন-উৎপাদিত ডিজেল সাধারণ ডিজেলের চেয়ে পরিষ্কারভাবে জ্বলতে পারে, সমালোচকরা বলছেন যে এর মূল পাইরোলাইসিস পদ্ধতিটি বহু দশকের পুরনো এবং এটি ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণ না করা হলে বিপজ্জনক যৌগ নির্গত করে বলে পরিচিত।
প্রধান উদ্বেগগুলির মধ্যে রয়েছে:
বিষাক্ত নিঃসরণ: প্লাস্টিকের পাইরোলাইসিস প্রক্রিয়া কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত না হলে অত্যন্ত বিষাক্ত পদার্থ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে পিভিসির মতো ক্লোরিনযুক্ত প্লাস্টিক প্রক্রিয়াজাত করার সময় ডাইঅক্সিন, ফিউরান এবং পলিক্লোরিনেটেড বাইফিনাইলস (PCBs) এর মতো বিষাক্ত দূষণকারী নির্গত হতে পারে।
দূষণকারী: বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে ডিজেলের মতো তৈরি এই জ্বালানিটিতে প্রচলিত গ্যাসোলিনের চেয়েও বেশি দূষণকারী পদার্থ থাকতে পারে।
শক্তির ভারসাম্য: বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রক্রিয়ায় প্রায়শই উৎপাদিত শক্তির চেয়ে বেশি শক্তি খরচ হয় এবং এটি কার্বন ডাইঅক্সাইড (CO₂) ও কার্বন মনোক্সাইডের (CO) মতো গ্রিনহাউস গ্যাসও তৈরি করে।
সুরক্ষার ঝুঁকি: রাসায়নিক প্রক্রিয়ার কারণে আগুন এবং বিস্ফোরণের ঝুঁকি থাকে। ব্রাউন নিজেও পরীক্ষার সময় পুড়ে গিয়েছিলেন, যা এই প্রযুক্তির নিরাপদ পরিচালনার জন্য সঠিক প্রকৌশলের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।
ভাইরাল খ্যাতি ও রহস্যময় অন্তর্ধান
ব্রাউন তার পরীক্ষা ও অগ্রগতির নথি টিকটক ও ইনস্টাগ্রামের মতো সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে শেয়ার করে বিশাল অনলাইন জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। তার যন্ত্র সফলভাবে একটি মাসল কার (muscle car)-কে শক্তি জোগানোর একটি ভাইরাল ভিডিওর পরে এই জন-আগ্রহ চরমে পৌঁছায়। তার উদ্ভাবনকে বড় আকারে করার জন্য শুরু করা GoFundMe ক্যাম্পেইনে ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে $১৮,০০০ এরও বেশি তহবিল সংগ্রহ হয়।
তবে, জুলাই ২০২৫-এ তার জীবন একটি রহস্যময় মোড় নেয়। বিপদের ইঙ্গিত দিয়ে কিছু বিভ্রান্তিকর পোস্ট করার পর তিনি হঠাৎ করেই সোশ্যাল মিডিয়া থেকে নিখোঁজ হয়ে যান। তার এই অনুপস্থিতি ব্যাপক গুজব ও ষড়যন্ত্র তত্ত্বে ইন্ধন যোগায়। যদিও পরে তার পরিবার তার নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করে, তবে এই সংক্ষিপ্ত অনুপস্থিতির বিষয়ে কোনো বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেনি।
সবমিলিয়ে, জুলিয়ান ব্রাউনের প্লাস্টোলিন আবিষ্কার নতুন ধরনের পুনর্ব্যবহার প্রযুক্তি এবং পরিবেশগত উদ্ভাবন নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা শুরু করেছে। তবে এর বৈজ্ঞানিক বৈধতা, পরিবেশগত নিরাপত্তা এবং দূষণ নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নগুলি অতিক্রম করতে পারলেই এর দীর্ঘমেয়াদী সাফল্য নির্ভর করবে।



