নিজস্ব প্রতিবেদন, তুফানগঞ্জ:
ভোর তখনো ফোটেনি উত্তরের আকাশে। কোচবিহারের তুফানগঞ্জে কুয়াশার চাদর সরিয়ে যখন প্রথম সূর্যরশ্মিটা পড়ল, তখন রাজপথ দেখল এক অন্য দৃশ্য। হাজার হাজার পা, হাতে লাল নিশান, আর কণ্ঠে সেই হারানো দিনের স্লোগান—‘বাংলা বাঁচাও’। নিছক কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি নয়, শুক্রবার সকাল থেকে শুরু হওয়া সিপিআই(এম)-এর এই যাত্রা যেন এক দীর্ঘশ্বাসের নাম। যে দীর্ঘশ্বাস গত এক দশকে জমেছে বাংলার প্রতিটি বন্ধ হয়ে যাওয়া স্কুলের বারান্দায়, প্রতিটি বেকার যুবকের হতাশ চোখের কোণে।
রক্তক্ষরণের বাংলা ও প্রতিবাদের পদধ্বনি
২৯ নভেম্বর থেকে ১৭ ডিসেম্বর। ক্যালেন্ডারের পাতায় মাত্র ১৯ দিন হলেও, এই দিনগুলোতে প্রায় ১০০০ কিলোমিটার পথ হাঁটবে বামেরা। কোচবিহার থেকে কামারহাটি—মানচিত্রে এই দূরত্ব শুধুই রাস্তার নয়, এ দূরত্ব এক যন্ত্রণার ইতিহাসের।
নেতৃত্ব যখন মাইকে গর্জে উঠছেন, তখন তাঁদের গলার স্বরে যতটা না রাজনীতির কৌশল, তার চেয়ে বেশি মিশে আছে হাহাকার। কেন এই যাত্রা? উত্তর লুকিয়ে আছে পরিসংখ্যানের আড়ালে থাকা মানবিক গল্পগুলোতে। রাজ্যে ৭,০০০-এর বেশি প্রাথমিক স্কুল আজ তালাবন্ধ। যে স্কুলগুলোর মাঠে একসময় শিশুদের কোলাহল থাকত, সেখানে আজ আগাছার জঙ্গল। গ্রামের যে ছেলেটি স্বপ্ন দেখত শিক্ষক হওয়ার, নিয়োগ দুর্নীতির করাল গ্রাসে তার স্বপ্ন আজ আদালতের ফাইলে বন্দি। এই ‘বাংলা বাঁচাও যাত্রা’ সেই সব লুপ্ত স্বপ্নকে রাস্তায় নামিয়ে আনার লড়াই।
উত্তরের পাহাড় থেকে দক্ষিণের সাগর: এক সুতোর টান
এই যাত্রা শুধু নেতাদের নয়। মিছিলে হাঁটছেন চা বাগানের সেই শ্রমিক, যার পিঠ বেঁকে গেছে ঝুড়ির ভারে অথচ বাড়েনি মজুরি। হাঁটছেন সেই মা, যার ছেলে পেটের দায়ে আজ ভিনরাজ্যে পরিযায়ী শ্রমিক। হাঁটছেন গ্রামের সেই বৃদ্ধ, যিনি পঞ্চায়েতে নিজের ভোটটা দিতে পারেননি।
সিপিআই(এম) রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম থেকে শুরু করে মীনাক্ষী মুখার্জির মতো তরুণ তুর্কিরা—সকলেই এক ধুলোমাখা পথের শরিক। তাঁদের দাবি, বাংলা আজ দ্বিমুখী আক্রমণে বিধ্বস্ত। একদিকে দুর্নীতির পাহাড়প্রমাণ বোঝা, অন্যদিকে সাম্প্রদায়িক বিভাজনের রাজনীতি। বাংলার সংস্কৃতি, বাংলার ভাষা, আর বাংলার মানুষের মেরুদণ্ড—সবই আজ সংকটের মুখে। এই ১০০০ কিলোমিটার পথ তাই হারানো আত্মসম্মান পুনরুদ্ধারের সরণি।
ধুলো আর ঘামের শপথ
যাত্রাপথে ১১টি জেলা ছুঁয়ে যাবে এই মিছিল। প্রতিটি জনপদ, প্রতিটি মোড় সাক্ষী থাকবে এক অঙ্গীকারের। উত্তরবঙ্গের জনজাতীয় মানুষের অভিমান থেকে শুরু করে দক্ষিণবঙ্গের সুন্দরবনের নোনা জলের কান্না—সব এসে মিশবে এই স্রোতে। পার্টির নবীন প্রজন্মের চোখেমুখে আজ আর ক্লান্তি নেই, আছে জেদ। যে জেদ বলছে, ২০২৬-এর ব্যালট বক্সের চেয়েও বড় লড়াই হলো বাংলার হৃত গৌরব ফিরিয়ে আনা।
নেতৃত্বের কথায়, "এ লড়াই ক্ষমতার অলিন্দে ফেরার লড়াই নয়, এ লড়াই বাংলার শ্বাস নেওয়ার লড়াই।" যখন নিয়োগের দাবিতে রাস্তায় বসে থাকা যোগ্য প্রার্থীর কান্নাকে শাসকদল উপহাস করে, তখন এই পদযাত্রাই হয়ে ওঠে তাঁদের একমাত্র আশ্রয়।
১৭ ডিসেম্বরের অপেক্ষা
ডিসেম্বরের হাড়হিম করা ঠান্ডায় যখন এই মিছিল কামারহাটিতে পৌঁছবে, তখন তার পিছনে পড়ে থাকবে ১০০০ কিলোমিটারের স্মৃতি। প্রতিটি পদক্ষেপ একটা করে প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে যাচ্ছে শাসকের দিকে—কোথায় গেল গ্রামের স্কুল? কেন খালি পেটে ঘুমায় শ্রমিক? কেন মেধাবীর জায়গা হয় জেলে আর দুর্নীতিবাজরা থাকে প্রাসাদে?
‘বাংলা বাঁচাও যাত্রা’ হয়তো রাজনীতির অঙ্ক কষবে, কিন্তু তার চেয়েও বড় সত্য হলো—এটি বাংলার বিবেককে নাড়িয়ে দেওয়ার এক প্রচেষ্টা। লাল পতাকার এই দীর্ঘ মিছিল আসলে বলতে চাইছে, "এখনো সময় আছে, জেগে ওঠো বাংলা।"
তুফানগঞ্জের ধুলো আজ কামারহাটির রাজপথ ছোঁয়ার অপেক্ষায়। পথ কঠিন, কিন্তু গন্তব্য স্পষ্ট—লুট ও বিভাজনের অন্ধকার সরিয়ে এক নতুন ভোরের সন্ধান।