নয়া দিল্লি, ১৬ ডিসেম্বর ২০২৫: মোদী সরকার ভারতের পরমাণু শক্তি ক্ষেত্রকে বেসরকারি এবং বিদেশি বিনিয়োগের জন্য উন্মুক্ত করতে সংসদে ‘শান্তি’ (SHANTI) বিল পেশ করার পর থেকেই রাজনৈতিক উত্তেজনা তুঙ্গে। সোমবার লোকসভায় বিলটি পেশ হওয়ার পর থেকেই বামপন্থী দল এবং বিরোধী জোট এই সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করেছে। তাদের অভিযোগ, ‘সংস্কার’-এর নামে সরকার দেশের কৌশলগত নিরাপত্তা এবং সার্বভৌমত্বকে কর্পোরেট সংস্থার হাতে তুলে দিচ্ছে।
বামপন্থীদের মূল আপত্তি কোথায়?
লোকসভায় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জিতেন্দ্র সিং ‘শান্তি’ বিল পেশ করার সময় দাবি করেন, ২০৪৭ সালের মধ্যে ১০০ গিগওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যেই এই বিল আনা হয়েছে। কিন্তু সিপিআই(এম) এবং অন্যান্য বাম দলের সাংসদরা বিলটিকে ‘জনস্বার্থ বিরোধী’ আখ্যা দিয়ে ওয়াকআউটের হুঁশিয়ারি দেন। বামেদের বিরোধিতার মূল জায়গাগুলো হলো:
১. নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন: বামপন্থীদের মতে, পরমাণু শক্তি ভারতের মতো দেশের জন্য কেবল বিদ্যুৎ উৎপাদনের উৎস নয়, এটি জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এই স্পর্শকাতর ক্ষেত্রে বিদেশি সংস্থা বা বেসরকারি মালিকানা (৪৯% পর্যন্ত) দেশের কৌশলগত স্বয়ংসম্পূর্ণতাকে দুর্বল করবে। সিপিআই(এম)-এর এক প্রবীণ নেতার কথায়, “যে ক্ষেত্রটি এতদিন কঠোর সরকারি নিয়ন্ত্রণে সুরক্ষিত ছিল, সেখানে মুনাফালোভী সংস্থার প্রবেশ জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বিপজ্জনক।”
২. দায়বদ্ধতা আইন লঘুকরণ (Dilution of Liability): সবথেকে বড় বিতর্কের বিষয় হলো ২০১০ সালের ‘সিভিল লায়াবিলিটি ফর নিউক্লিয়ার ড্যামেজ অ্যাক্ট’ (CLND Act) বাতিল করা।
৩. মুনাফা বনাম মানুষের জীবন: বামপন্থী ট্রেড ইউনিয়নগুলোর আশঙ্কা, বেসরকারি সংস্থাগুলো মুনাফা বাড়াতে নিরাপত্তা খাতে খরচ কমাবে (Cost Cutting), যার ফলে ফুকুশিমা বা চেরনোবিলের মতো বিপর্যয়ের ঝুঁকি বাড়বে। সরকার যেখানে জনকল্যাণের কথা ভাবে, বেসরকারি সংস্থা সেখানে কেবল ব্যালেন্স শিট দেখবে—এই যুক্তি তুলে ধরেই তারা বিলের বিরোধিতা করছেন।
বিরোধী জোটের অবস্থান
বামপন্থীদের পাশাপাশি কংগ্রেসও বিলটি তাড়াহুড়ো করে পাস না করার দাবি জানিয়েছে। কংগ্রেসের প্রবীণ নেতা জয়রাম রমেশ বিলটিকে অবিলম্বে সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে (Standing Committee) পাঠানোর দাবি জানিয়েছেন।3 বিরোধীদের মতে, এত বড় নীতিগত পরিবর্তনের আগে বিশদ আলোচনার প্রয়োজন।
সরকারের যুক্তি
সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নেট জিরো (Net Zero) লক্ষ্যমাত্রা পূরণ এবং ক্লিন এনার্জির জোগান নিশ্চিত করতে বিপুল পুঁজির প্রয়োজন, যা কেবল সরকারি কোষাগার থেকে মেটানো সম্ভব নয়। তাই ‘শান্তি’ বিলের মাধ্যমে ছোট মডিউলার রিঅ্যাক্টর (SMR) তৈরি এবং প্রযুক্তির আধুনিকায়নের পথ প্রশস্ত করা হচ্ছে।
তবে সংসদ ভবনের বাইরে বামপন্থী সংগঠনগুলো ইতিমধ্যেই এই বিলের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ কর্মসূচির ডাক দিয়েছে। তাদের সাফ কথা, “কৌশলগত ক্ষেত্র বিক্রি করে উন্নয়ন হতে পারে না।”
এই বিল ঘিরে আগামী দিনগুলোতে সংসদের শীতকালীন অধিবেশন আরও উত্তপ্ত হতে চলেছে বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল।


