দুর্গাপুর: আজ দুর্গাপুরের চণ্ডীদাস বাজারে সিপিআইএম-এর 'বাংলা বাঁচাও' যাত্রার এক জনসভায় কড়া ভাষায় রাজ্য ও কেন্দ্র সরকারকে বিঁধলেন পার্টির যুবনেত্রী তথা জেএনইউ ছাত্র সংসদের প্রাক্তন সভানেত্রী ঐশী ঘোষ। গত সাত দিন ধরে জেলার বিভিন্ন প্রান্তে ঘোরার পর আজ এই পদযাত্রা চণ্ডীদাস বাজারে এসে পৌঁছয়। সভায় উপস্থিত ছিলেন পলিটব্যুরো সদস্য মহম্মদ সেলিম এবং কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য আভাস রায়চৌধুরী সহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ।
ঐশী ঘোষ তাঁর দীর্ঘ বক্তব্যে রাজ্যের শিক্ষা, কর্মসংস্থান, নারী নিরাপত্তা এবং সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিরুদ্ধে সরব হন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, "আজ কেন বাংলা বাঁচানোর কথা বলতে হচ্ছে? বাংলা কি সত্যিই মরে যাচ্ছে?" তাঁর মতে, পরিযায়ী শ্রমিকদের ভিন রাজ্যে লাঞ্ছনা এবং রাজ্যের মধ্যে হাজার হাজার স্কুল বন্ধ হওয়ার মতো ঘটনাগুলোই প্রমাণ করে যে বাংলা আজ গভীর সংকটে।
বক্তব্যের মূল বিষয়সমূহ:
শিক্ষা বনাম মদের দোকান: ঐশী ঘোষ অভিযোগ করেন যে গত ১৪ বছরে রাজ্যে ৮,০০০-এর বেশি স্কুল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, অথচ তার জায়গায় ২২,০০০-এর বেশি মদের দোকান খোলা হয়েছে। তিনি বলেন, "বাংলা বাঁচানোর অর্থ হলো ১৪ তলার নবান্ন বা পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের বান্ধবীর খাটের তলার টাকা নয়; বাংলা মানে হলো শ্রমজীবী মানুষের ঐক্য, তাদের হাতে কাজ এবং সবার জন্য শিক্ষার অধিকার।"
নারী নিরাপত্তা ও মুখ্যমন্ত্রী: কামদুনি, পার্কস্ট্রিট থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক আরজিকর এবং দুর্গাপুরের ঘটনা উল্লেখ করে তিনি রাজ্যের নারী নিরাপত্তা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। মুখ্যমন্ত্রীর বিভিন্ন সময়ে করা মন্তব্যের সমালোচনা করে তিনি বলেন, রাজ্যের নারী নিরাপত্তা আজ প্রশ্নের মুখে, অথচ মুখ্যমন্ত্রী বিষয়গুলিকে লঘু করার চেষ্টা করছেন।
ধর্মীয় মেরুকরণের রাজনীতি: ঐশী ঘোষ বিজেপি এবং তৃণমূল উভয় দলকেই ধর্মের নামে রাজনীতি করার জন্য দায়ী করেন। তিনি বলেন, "একদিকে বিজেপি গীতা পাঠের কথা বলে, অন্যদিকে তৃণমূলের কিছু নেতা কুরআনের কথা বলে বিভাজন তৈরি করছে। কিন্তু বাংলার মানুষ জানে, ধর্ম বা জাতের নামে এই রাজ্যকে ভাগ করা যায় না।" তিনি প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু এবং বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের কথা স্মরণ করিয়ে দেন, যারা কঠোর হাতে দাঙ্গা দমন করেছিলেন এবং জানিয়েছিলেন যে দাঙ্গাবাজদের কোনো ধর্ম হয় না।
নিয়োগ দুর্নীতি: নিয়োগ দুর্নীতির বিরুদ্ধে আন্দোলনরত পরীক্ষার্থীদের দুর্দশার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, যোগ্য প্রার্থীরা ২৬,০০০ চাকরিপ্রার্থী রাস্তায় বসে লড়াই করছেন, অনেকে আত্মহত্যা করতে বাধ্য হচ্ছেন, আর টাকার বিনিময়ে চাকরি বিক্রি হচ্ছে।
কেন্দ্রের বিরুদ্ধে তোপ: কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধেও তিনি সরব হন। তাঁর অভিযোগ, "মোদী-শাহ দেশ বিক্রি করছেন, আর আম্বানি-আদানি কিনছেন। রেল, এলআইসি, বিমানবন্দর সব একে একে বিক্রি হয়ে যাচ্ছে।" তিনি বলেন, আদানি-আম্বানির স্বার্থরক্ষা করাই এখন কেন্দ্রীয় সরকারের মূল এজেন্ডা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বক্তব্যের শেষে তিনি বশির বদ্রের একটি শায়েরি উদ্ধৃত করে বলেন, "লোগ টুট যাতে হ্যায় এক ঘর ব banane মে, তুম তারাস নেহি খাতে হো বস্তি জালানে মে।" তিনি আরএসএস এবং বিজেপির বিভাজনের রাজনীতির বিরুদ্ধে শ্রমজীবী মানুষকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান এবং লাল ঝাণ্ডাকে শক্তিশালী করার ডাক দেন। তাঁর মতে, "বাংলা মানে কোনো নির্দিষ্ট ধর্ম বা জাত নয়, বাংলা মানে শ্রমজীবী মানুষের অধিকার রক্ষার লড়াই।"
সভায় উপস্থিত সাধারণ মানুষের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। ঐশী ঘোষের এই তেজদীপ্ত ভাষণ আসন্ন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বামপন্থীদের নতুন করে অক্সিজেন জোগাবে বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল।





