বিশেষ প্রতিবেদন | ডাভোস, সুইজারল্যান্ড
সুইজারল্যান্ডের আল্পস পর্বতমালার কোলে বরফশীতল শহর ডাভোসে ১৯ জানুয়ারি থেকে শুরু হয়েছে ২০২৬ সালের ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) বার্ষিক সম্মেলন। ২৩ জানুয়ারি পর্যন্ত চলা এই সম্মেলনে বিশ্বের অন্তত ১০০টি দেশের রাষ্ট্রপ্রধান, বহুজাতিক কোম্পানির সিইও এবং শত শত বিলিয়নেয়ার এক ছাদের নিচে জড়ো হয়েছেন। কিন্তু এই ‘অভিজাত’ সম্মেলনটি এবার আর শুধু আলোচনার টেবিলে সীমাবদ্ধ নেই; এটি পরিণত হয়েছে তীব্র জনরোষ আর বিশ্বব্যাপী সমালোচনার কেন্দ্রে।
১. আকাশের দখল যখন গুটিকয়েক ধনকুবেরের হাতে
সম্মেলনের মূল প্রতিপাদ্য ‘খণ্ডিত বিশ্বে সংলাপের চেতনা’ হলেও, খোদ ডব্লিউইএফ-এর অংশগ্রহণকারীরাই বিশ্বের মধ্যে একটি বিশাল বিভাজন রেখা টেনে দিয়েছেন। গ্রিনপিসের সাম্প্রতিক তথ্য অনুসারে, সম্মেলনে যোগ দিতে আসা প্রতিনিধিদের জন্য ব্যক্তিগত জেটের ব্যবহার এবার অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে।
প্রতিবেদনে দেখা গেছে, এ বছর প্রতি চারজন অংশগ্রহণকারীর জন্য গড়ে একটি করে প্রাইভেট জেট ব্যবহৃত হচ্ছে। জুরিখ, সেন্ট গ্যালেন এবং আল্টেনরেন বিমানবন্দরগুলো এখন ব্যক্তিগত বিমানের ভিড়ে ঠাসা। এই জেট বিমানগুলো সাধারণ যাত্রীবাহী বিমানের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি কার্বন ডাই অক্সাইড নিঃসরণ করে। পরিবেশবাদীদের মতে, এটি স্রেফ বিলাসিতা নয়, বরং পৃথিবীর পরিবেশের সাথে একটি ‘নিষ্ঠুর পরিহাস’।
২. “ওয়াগিউ স্টেক বনাম পোকামাকড়”: বৈষম্যের এক চরম রূপ
ব্রিটিশ রাজনীতিবিদ ও হেরিটেজ পার্টির নেতা ডেভিড কুর্টেন তার সোশ্যাল মিডিয়া হ্যান্ডেলে যে বিস্ফোরণ ঘটিয়েছেন, তা এখন সাধারণ মানুষের মনের ক্ষোভের প্রতিচ্ছবি। তিনি লিখেছেন—
"এই গ্লোবালিস্ট গ্যাংস্টাররা ব্যক্তিগত জেটে উড়ে এসে পাঁচতারা হোটেলের উষ্ণতায় বসে কয়েক হাজার ডলারের ওয়াগিউ স্টেক খাচ্ছেন। আর তারা সেখানে বসে আমাদের জন্য ফতোয়া দিচ্ছেন যে, পৃথিবী বাঁচাতে সাধারণ মানুষকে মাংস খাওয়া ছেড়ে পোকামাকড় খেতে হবে এবং ব্যক্তিগত গাড়ি ছেড়ে সাইকেলে ঘুরতে হবে।"
এই মন্তব্যটি মূলত ডাভোসে উপস্থিত থাকা এলিট শ্রেণীর দ্বিচারিতাকেই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে। সাধারণ মানুষ যখন বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতি আর জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধিতে হিমশিম খাচ্ছে, তখন ডাভোসের অতিথিদের এই জৌলুস এক ধরনের সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করছে।
৩. গ্রিনপিস ও পরিবেশবাদীদের হুঁশিয়ারি
গ্রিনপিস ইন্টারন্যাশনালের কর্মকর্তা হারউইগ শুস্টার এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, “ডাভোস এখন ‘ক্লাইমেট হিপোক্রিসি’ বা জলবায়ু ভণ্ডামির আন্তর্জাতিক সদর দপ্তরে পরিণত হয়েছে। যে মানুষগুলো এখানে কার্বন ট্যাক্স আর পরিবেশ রক্ষার নীতি নির্ধারণ করতে এসেছেন, তারাই সবচেয়ে বেশি কার্বন নিঃসরণ করে এখানে পৌঁছেছেন। এটা মেনে নেওয়া যায় না।”
ইউরোনিউজ এবং বিজনেস ইনসাইডারের রিপোর্টে প্রকাশ পেয়েছে যে, গত কয়েক দিনে ডাভোস অভিমুখে শত শত শর্ট-হিস্টোরিক ফ্লাইট উড়েছে, যার অনেকগুলোই মাত্র ২০ থেকে ৩০ মিনিটের যাত্রা ছিল—যে পথটুকু সহজেই ট্রেনে পাড়ি দেওয়া সম্ভব ছিল।
৪. সাধারণের দাবি: বিশেষ কর ও কঠোর নিষেধাজ্ঞা
বিশ্বজুড়ে এখন একটাই দাবি জোরালো হচ্ছে—এই ধরনের ব্যক্তিগত ভ্রমণের ওপর অতি-ধনীদের জন্য বিশেষ ‘বিলাসিতা কর’ বা ‘কার্বন কর’ আরোপ করা হোক। সমালোচকরা বলছেন, সাধারণ মানুষের জন্য খড়গহস্ত না হয়ে বরং এই মুষ্টিমেয় কয়েক হাজার মানুষের বিলাসবহুল জীবনযাত্রার লাগাম টেনে ধরলেই পৃথিবী অনেক বেশি সুরক্ষিত থাকবে।
৫. আড়ালে থাকা সত্য
ডব্লিউইএফ-এর এবারের এজেন্ডায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বিশ্ব অর্থনীতি এবং ভূ-রাজনীতি থাকলেও, ব্যক্তিগত জেটের কালো ধোঁয়া সেই সব আলোচনাকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মোতায়েন করা হয়েছে প্রায় ৫০০০ সেনাসদস্য, যা একটি ছোটখাটো যুদ্ধের প্রস্তুতির সমান।
ডাভোস সম্মেলন শেষ হবে ২৩ জানুয়ারি। কিন্তু যে প্রশ্নগুলো এখানে উত্থাপিত হয়েছে, তা হয়তো দীর্ঘ সময় বিশ্ববাসীকে তাড়িয়ে বেড়াবে। পৃথিবী কি সত্যিই রক্ষা পাবে, নাকি রক্ষার নামে কেবল সাধারণের পকেট কাটা হবে আর ধনকুবেররা তাদের জেটে চড়ে পৃথিবীর ধ্বংসলীলা ওপর থেকে দেখবে?


