নিজস্ব প্রতিনিধি, দুর্গাপুর: ইস্পাত নগরীর যান্ত্রিক কোলাহল ছাপিয়ে গত ২৫শে জানুয়ারি এক অন্যরকম হৃদস্পন্দন অনুভূত হলো দুর্গাপুরের আশিস মার্কেটে। ইট-কাঠ-পাথরের ব্যস্ততার মাঝে যেন থমকে দাঁড়িয়েছিল এক চিলতে সবুজ। ‘দুর্গাপুর হিরোজ’ ও ‘উইংস’-এর হাত ধরে আয়োজিত ‘জীববৈচিত্র্য ও আলোকচিত্র প্রদর্শনী’ কেবল একটি অনুষ্ঠান নয়, বরং তা হয়ে উঠল বিপন্ন প্রকৃতির জন্য এক আকুল আর্তি।
এদিন প্রধান বক্তা ডঃ সাগর অধুর্যের কথায় উঠে এল এক বিস্ময়কর সত্য—আমাদের এই অতি পরিচিত দুর্গাপুর-আসানসোল অঞ্চলেই ডানা মেলে ওড়ে ৪৫০-এরও বেশি প্রজাতির প্রাণ। অথচ ব্যস্ততার ভিড়ে আমরা কি একবারও তাকাই সেই 'ছোট পানকৌড়ি' বা 'ধুপনি বক'-এর দিকে? ডঃ অধুর্য তাঁর স্লাইড প্রেজেন্টেশনে যখন পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাখি 'সাদা বুক মাছরাঙা' বা মহারাষ্ট্রের রাজ্যপাখি 'হরিয়াল'-এর সৌন্দর্য বর্ণনা করছিলেন, তখন গ্যালারিতে উপস্থিত শ্রোতাদের চোখেমুখে ছিল এক অদ্ভুত বিষাদমাখা বিস্ময়।
হারানো সুরের সন্ধান:
দুর্গাপুর এক অনন্য মিলনস্থল—যেখানে ছোটনাগপুর মালভূমি আর গাঙ্গেয় সমভূমি এসে একে অপরের হাত ধরেছে। এই মহামিলনের ফলেই এখানে বাসা বাঁধে রঙ-বেরঙের প্রজাপতি 'কমন পিয়েরো' কিংবা উদাস দুপুরে ডাক দিয়ে যায় 'বসন্তবৌরী'। বক্তারা আবেগের সুরে মনে করিয়ে দিলেন, জীববৈচিত্র্য কেবল পরিবেশের ভারসাম্য নয়, বরং আমাদের সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। আমাদের লোকগাথা, উৎসব আর মাঙ্গলিক আয়োজনে যে পাখিরা মিশে থাকে, বাস্তবে তারা আজ আমাদের অবহেলায় ডানা ঝাপটাচ্ছে।
ফ্রেমবন্দি কান্না ও আশা:
অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ছিল স্থানীয় আলোকচিত্রীদের তোলা ছবি। প্রতিটি ছবি যেন কথা বলছিল—কোনোটিতে ছিল ডানা ভেজা পাখির ক্লান্তি, কোনোটিতে নীল আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকা বুনো ফুলের মৌন তৃষ্ণা। প্রদর্শনীর এই ছবিগুলো আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছিল যে, 'প্রকৃতির বন্ধু হওয়া' কোনো সৌখিনতা নয়, বরং বেঁচে থাকার একমাত্র পথ।
আয়োজকদের আশা, এই প্রদর্শনী কেবল কয়েক ঘণ্টার অনুষ্ঠান হয়ে থাকবে না। প্রতিটি দর্শক যেন ঘরে ফেরার সময় হৃদয়ে নিয়ে যান এক প্রতিজ্ঞা—আগামী প্রজন্মের জন্য এক সবুজ পৃথিবী রেখে যাওয়ার অঙ্গীকার।
“আমাদের চারপাশে ছড়িয়ে থাকা এই রঙিন ডানাগুলো যেন হারিয়ে না যায়, আসুন আমরা সবাই মিলে আরেকবার প্রকৃতির বন্ধু হই।”



















