নিজস্ব প্রতিনিধি, কাটোয়া:
আকাশে শরতের মেঘ নয়, বরং কর্মহীনতার কালো মেঘ জমেছে গত কয়েক দশকে। শ্রীখণ্ড থেকে কাটোয়া— এই দীর্ঘ পথটুকু আজ আর কেবল পিচঢালা রাস্তা রইল না, হয়ে উঠল বঞ্চিত মানুষের কান্নার প্রতিধ্বনি। কাটোয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য অধিগৃহীত সেই ধূ ধূ করা জমিতে আজও কোনো চিমনি দিয়ে ধোঁয়া ওঠেনি, কোনো সাইরেন বাজেনি। বেজেছে শুধু একরাশ কর্মহীন যুবকের দীর্ঘশ্বাস।
হাহাকার যখন মিছিলে মেশে
মিছিলের সামনের সারিতে হাঁটছিলেন এক বৃদ্ধ কৃষক। চোখে ছানি পড়লেও লক্ষ্যটা পরিষ্কার। কাঁপাকাঁপা গলায় বললেন, "বাবা, জমি দিয়েছিলাম কারখানার আশায়। ছেলেটা কাজ পাবে ভেবেছিলাম। জমি গেল, কাজও এল না। আজ ছেলেটা ভিন রাজ্যে লেবার খাটতে গেছে। আমরা কি শুধু জমি হারাবার জন্যই জন্মেছি?"
এই প্রশ্নটা কেবল তাঁর একার নয়, শ্রীখণ্ড থেকে মিছিলে যোগ দেওয়া হাজার হাজার তরুণ-তরুণীর। তাঁদের হাতে থাকা লাল ঝাণ্ডাগুলো যেন রোদ লেগে আরও রক্তিম হয়ে উঠছে। তাঁদের দাবি পরিষ্কার— অনেক হয়েছে অবহেলা, এবার চাই অধিকার।
কেন এই পদযাত্রা?
বন্ধ্যা জমি: তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য জমি নেওয়া হয়েছিল কয়েক বছর আগে, কিন্তু আজও সেখানে শিল্পের কোনো চিহ্ন নেই।
পরিযায়ী জীবনের যন্ত্রণা: ঘরের ছেলে ঘরে কাজ না পেয়ে পাড়ি দিচ্ছে কেরালা বা চেন্নাইয়ে। ঘরের মা-বোনেদের চোখের জল মুছিয়ে দেওয়ার কেউ নেই।
বিকল্পের সন্ধান: মিছিলের স্লোগানে বারবার ফিরে আসছে সেই পুরনো দিনগুলোর কথা, যখন শিল্পায়নের স্বপ্ন ছিল চোখে। তাই তো তাদের দাবি— বামপন্থার হাত ধরেই আসুক বাংলার নতুন ভোর।
জনসমুদ্রের গর্জন
শ্রীখণ্ড থেকে যখন পদযাত্রা শুরু হয়, তখন সেটা ছিল একটা ছোট নদী। কিন্তু কাটোয়া শহরের ঢোকার মুখে তা যেন এক উত্তাল সমুদ্র। সাধারণ মানুষ বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখছিলেন এই লড়াই। স্কুলছুট কিশোর থেকে শুরু করে শিক্ষিত বেকার যুবক— সবার চোখেমুখেই এক নাছোড়বান্দা জেদ।
নেতৃত্বের কণ্ঠে ঝরে পড়ল হুঁশিয়ারি— "এই মাটি আমাদের, এই স্বপ্ন আমাদের। যে জমিতে চাষ হতো, সেখানে যদি কলকারখানা না হয়, তবে সেই বঞ্চনার জবাব দেবে কাটোয়ার মানুষ।"
দিনের শেষে সূর্য যখন কাটোয়া স্টেশনের ওপারে ঢলে পড়ছে, তখন মিছিল হয়তো শেষ হয়েছে, কিন্তু মেঠো পথের সেই ধুলো আজও কথা বলছে। সেই ধুলো মিশে আছে হাজারো পরিবারের না মেটা চাহিদার সাথে। কাটোয়া আজ উত্তরের অপেক্ষায়। বাম পন্থার সেই লাল ঝাণ্ডার তলায় আজ মানুষের একটাই প্রার্থনা— "হাত পেতে নয়, কাজ করে বাঁচতে চাই।"



