হুগলি: রাজনীতির অলিগলিতে যখন হাজারো জল্পনা, যখন দলবদলের খেলায় মানুষের বিশ্বাস তলানিতে, ঠিক তখনই পাণ্ডুয়ায় দাঁড়িয়ে এক অন্য মহম্মদ সেলিমকে দেখল বাংলা। কেবল রাজনৈতিক সমীকরণ নয়, অভিজ্ঞ নেতার গলায় শোনা গেল আক্ষেপ, অভিমান এবং চরম সতর্কবাণী। হুমায়ুন কবীরের সঙ্গে জোট হবে কি না—সেই যান্ত্রিক প্রশ্নের উত্তরে আবেগ এবং রাজনৈতিক প্রজ্ঞাকে এক সুতোয় গাঁথলেন সিপিআইএম রাজ্য সম্পাদক।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে সোজাসাপ্টা মেজাজে সেলিম বললেন, "কারও মুখে ঝাল খায় না মহম্মদ সেলিম।" তাঁর এই একটি বাক্যেই যেন চূর্ণ হয়ে গেল সমস্ত জল্পনার ফানুস। তিনি স্পষ্ট বুঝিয়ে দিলেন, হাওয়ায় ভেসে বা অন্যের প্ররোচনায় পা দিয়ে কোনও সিদ্ধান্ত নেবে না আলিমুদ্দিন। রাজনীতির 'পুডিং' আগে চেখে দেখবেন, তার স্বাদ বুঝবেন, তবেই সিদ্ধান্ত। তাঁর কথায়, "জামা কিনতে গেলে যেমন চারবার টেনেটুনে দেখা হয় মাপ ঠিক আছে কি না, রাজনীতির ক্ষেত্রেও মাপজোক করে নিতে হয়।" এই সতর্কতার আড়ালে লুকিয়ে ছিল অতীতের বহু রাজনৈতিক বিশ্বাসঘাতকতার ইতিহাস, যা বামপন্থীরা ভোলেনি।
হুমায়ুন কবীরের বারবার দলবদল নিয়ে কথা বলতে গিয়ে সেলিমের গলায় ঝরে পড়ল তীব্র শ্লেষ। যে মানুষটি সকালে এক দলে তো বিকেলে অন্য দলে, তাঁকে নিয়ে যে চটজলদি কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে না, তা বুঝিয়ে দিলেন তিনি। তাঁর কথায় উঠে এল এক নির্মম সত্য—কীভাবে রাজনীতির ময়দানে আদর্শের চেয়ে সুযোগসন্ধান বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তবে এদিন সেলিমের কথায় সবচেয়ে বেশি আবেগ ছিল সংবাদমাধ্যম এবং সাংবাদিকদের জন্য। কর্পোরেটের গ্রাসে চলে যাওয়া মিডিয়া জগতের দিকে তাকিয়ে একরাশ আক্ষেপ নিয়ে তিনি বললেন, "শ্রমিকের যেমন মজুরি নেই, সাংবাদিকদেরও আজ মর্যাদা নেই। ওয়েজবোর্ড নেই, বোনাস নেই, ছুটি নেই—সব কেড়ে নেওয়া হয়েছে।" একসময়ের দাপুটে সাংবাদিকতা আজ যে মালিকপক্ষের নির্দেশে চলছে, তা বলতে গিয়ে তাঁর কণ্ঠে ছিল সহমর্মিতার সুর। তিনি মনে করিয়ে দিলেন, বামপন্থীরা দুর্বল হয়েছে বলেই আজ কলমও পরাধীন।
কংগ্রেসের সঙ্গে জোট নিয়েও এদিন কোনও রাখঢাক করেননি সেলিম। অধীর চৌধুরীর সময়ের লড়াকু দিনগুলোর কথা স্মরণ করার পাশাপাশি বর্তমান নেতৃত্বের দোলাচল নিয়ে উগরে দিলেন ক্ষোভ। শুভঙ্কর সরকারের নাম না করেই তাঁর বার্তা, "তৃণমূলের প্রতি দরদ থাকলে সেটা তাঁদের ব্যাপার। কিন্তু আমরা অনন্তকাল অপেক্ষা করব না।" তাঁর এই দৃপ্ত ঘোষণায় বুঝিয়ে দিল, বামফ্রন্ট লড়াইয়ের ময়দানে নেমে পড়েছে, কারোর করুণার অপেক্ষায় তারা বসে নেই।
সবশেষে, বিভাজনের রাজনীতির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে এক মানবিকতার ডাক দিলেন সিপিআইএম নেতা। মন্দির-মসজিদ আর হিন্দু-মুসলমানের রাজনীতির বাইরে এসে তিনি কথা বললেন মানুষের পেটের খিদে নিয়ে, রুটি-রুজি নিয়ে। তাঁর আবেগী আর্জি, "মানুষকে মানুষ মনে করুন। কাজের কথা বলুন, শ্রমের কথা বলুন। ভাগাভাগির রাজনীতি আমাদের সর্বনাশ করছে।"
পাণ্ডুয়ায় সেলিমের এই সাংবাদিক বৈঠক কেবল জোটের জল্পনা মেটানোর জন্য ছিল না, এটি ছিল হারানো মূল্যবোধ আর ধুঁকতে থাকা রাজনৈতিক সততাকে জাগিয়ে তোলার এক মরিয়া চেষ্টা।