নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা | ২০ জানুয়ারি, ২০২৬
পশ্চিমবঙ্গে আসন্ন ২০২৬ বিধানসভা নির্বাচনের আগে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (SIR) প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক উত্তাপ চরমে পৌঁছেছে। ৬ নম্বর ও ৭ নম্বর ফর্ম জমা দেওয়া নিয়ে তৃণমূল কংগ্রেস এবং বিজেপির মধ্যে শুরু হয়েছে এক মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ। একদিকে যেমন গণহারে ফর্ম জমা দেওয়ার ঘটনা ঘটছে, অন্যদিকে তেমনই একে ‘গণতান্ত্রিক হত্যা’ বলে সরব হয়েছে শাসক দল।
বিতর্কের মূলে ৬ ও ৭ নম্বর ফর্ম
সাধারণত ভোটার তালিকায় নাম তুলতে ৬ নম্বর ফর্ম এবং নাম বাদ দিতে বা আপত্তি জানাতে ৭ নম্বর ফর্ম ব্যবহৃত হয়। নির্বাচন কমিশনের নিয়ম অনুযায়ী, এই ফর্মগুলি জমা দেওয়া প্রতিটি নাগরিকের ব্যক্তিগত অধিকার। তবে বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, রাজনৈতিক দলগুলোর বুথ লেভেল এজেন্টরা (BLA) সাধারণ মানুষের হয়ে এই ফর্মগুলি সংগ্রহ ও জমা দেওয়ার কাজে প্রধান ভূমিকা নিচ্ছেন।
বিজেপির দাবি, তারা ভুয়া ভোটার বা মৃত ব্যক্তিদের নাম সরাতে স্বচ্ছতার স্বার্থে ৭ নম্বর ফর্ম জমা দিচ্ছে। অন্যদিকে, তৃণমূলের অভিযোগ—বিজেপি পরিকল্পিতভাবে প্রান্তিক ও সংখ্যালঘু ভোটারদের নাম বাদ দেওয়ার জন্য এই ফর্মগুলিকে ‘অস্ত্র’ হিসেবে ব্যবহার করছে।
পলিটিক্যাল বাইনারি: আতঙ্ক বনাম বাস্তবতা
রাজনীতির ময়দানে এই প্রক্রিয়াকে এক ভয়াবহ রূপ দেওয়া হলেও, মাঠপর্যায়ের চিত্রটি কিছুটা ভিন্ন:
বাল্ক ফর্ম বিতর্ক: বাঁকুড়া বা বীরভূমের মতো জেলাগুলিতে গাড়ি ভর্তি প্রাক-পূরণকৃত ৭ নম্বর ফর্ম উদ্ধারের ঘটনাকে কেন্দ্র করে যে উত্তেজনা ছড়িয়েছে, তা আসলে রাজনৈতিক আধিপত্যের লড়াই। আইনত, বাল্ক বা গুচ্ছাকারে ফর্ম জমা দেওয়ার ওপর কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই, তবে প্রতিটি ফর্মের সঙ্গে আবেদনকারীর স্বাক্ষর ও সঠিক ঘোষণাপত্র থাকা বাধ্যতামূলক।
ভয়ঙ্কর কিছু কি ঘটছে? রাজনৈতিক বয়ানে একে ‘ভোটার ছাঁটাই’ বা ‘অনুপ্রবেশকারী হঠাও’ অভিযান বলা হলেও, এটি আসলে একটি পরিচ্ছন্ন ভোটার তালিকা তৈরির প্রশাসনিক পদক্ষেপ।
1 ৫8 লক্ষ নাম যে ড্রাফট তালিকা থেকে বাদ পড়েছে, তার বড় অংশই মৃত বা স্থানান্তরিত ভোটার।
সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপ ও স্বচ্ছতা
গতকাল, ১৯শে জানুয়ারি, ২০২৬ তারিখে সুপ্রিম কোর্ট এক ঐতিহাসিক নির্দেশে জানিয়েছে যে, ভোটার তালিকায় যাদের নাম নিয়ে ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি’ (যেমন বয়স বা সম্পর্কের অমিল) পাওয়া গেছে, তাদের নামের তালিকা গ্রাম পঞ্চায়েত ও ব্লক অফিসগুলিতে প্রকাশ্যে টাঙিয়ে দিতে হবে। কোর্ট আরও ১০ দিন সময় বাড়িয়ে দিয়েছে যাতে কেউ বঞ্চিত না হন। এতে অন্ধকারের রাজনীতি বা গোপনে নাম কাটার ভয় অনেকাংশে দূর হয়েছে।
এক নজরে বর্তমান স্থিতি (জানুয়ারি ২০২৬)
| ক্যাটাগরি | বর্তমান পরিসংখ্যান |
| মোট বাদ পড়া নাম (Draft Roll) | প্রায় ৫৮ লক্ষ (মৃত, স্থানান্তরিত ও ডুপ্লিকেট) |
| লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি (নোটিশ) | প্রায় ১.২৬ কোটি ভোটার |
| আপত্তি নিষ্পত্তির শেষ তারিখ | ৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ |
| চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ | ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ |
দায়বদ্ধতা ভোটারেরই
রাজনৈতিক দলগুলি যাই নাটক করুক না কেন, দিনের শেষে ভোটার তালিকায় নিজের নাম নিশ্চিত করার দায়িত্ব ভোটারেরই। বিএলও (BLO) বা রাজনৈতিক এজেন্টদের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভর না করে অনলাইন বা অ্যাপের মাধ্যমে নিজের স্থিতি পরীক্ষা করা সবচেয়ে নিরাপদ। এটি কোনো ‘ভয়ঙ্কর থ্রেট’ নয়, বরং একটি ডিজিটাল ও নির্ভুল গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অংশ।


