১. কট্টরপন্থার বিরুদ্ধে 'প্রতিরোধের দুর্গ'
২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির প্রভাব বাড়ার যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল, তার বিরুদ্ধে সবথেকে শক্তিশালী এবং স্বচ্ছ অবস্থান নিয়েছে বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) এবং বাম গণতান্ত্রিক জোট। সাধারণ মানুষের মধ্যে বিশেষ করে 'তালিবানি' ধাঁচের শাসনব্যবস্থা চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টার বিরুদ্ধে বামপন্থীদের অসাম্প্রদায়িক ও প্রগতিশীল অবস্থান ব্যাপক সাড়া ফেলছে।
২. সংখ্যালঘু ও সচেতন সমাজের নতুন ভরসা
দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায় একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের ওপর নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তারা এখন চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। এই ক্রান্তিকালে বামপন্থীরা যেভাবে মাঠে নেমে সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা এবং সমঅধিকারের কথা বলছে, তাতে সনাতনী ধর্মাবলম্বীদের একটি বড় অংশ এবার 'লাল পতাকা'র নিচে সমবেত হচ্ছে। শুধু তাই নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং সচেতন নাগরিক সমাজও এখন দ্বি-দলীয় বৃত্তের বাইরে বেরিয়ে একটি বৈষম্যহীন সমাজ গঠনে বামপন্থীদের সমর্থন দিচ্ছে।
৩. শিক্ষিত নারী নেতৃত্বের জয়জয়কার: ডা. মণীষা ও ইঞ্জিনিয়ার শম্পা
এবারের নির্বাচনে দুই লড়াকু নারী নেত্রী সারা দেশের আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছেন।
ডা. মণীষা চক্রবর্তী (বরিশাল-৫): বরিশালের রাজপথে রিকশা চালকদের অধিকার রক্ষা থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের চিকিৎসাসেবা—সবখানেই তিনি অগ্রণী। তাঁর নির্বাচনী তহবিল সংগ্রহের অভিনব পদ্ধতি (জনগণের কাছ থেকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গণচাঁদা বা 'মাটির ব্যাংক') বাংলাদেশের রাজনীতিতে সততার এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
ইঞ্জিনিয়ার শম্পা বসু (মাগুরা-১): প্রগতিশীল ছাত্র আন্দোলন থেকে উঠে আসা এই নেত্রী মাগুরার সাধারণ মানুষের কাছে এক আস্থার নাম। তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা এবং সাহসিকতা এবার মাগুরা-১ আসনে নতুন মেরুকরণ তৈরি করেছে।
এই দুই 'সনাতনী' বোনের লড়াইকে সাধারণ মানুষ কেবল রাজনৈতিক লড়াই হিসেবে দেখছে না, বরং একে দেখা হচ্ছে নারী শক্তি এবং অসাম্প্রদায়িকতার প্রতীক হিসেবে।
৪. সংসদ কি এবার লাল হবে?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এবার সংসদীয় আসনগুলোতে বামপন্থীদের জয়ের সম্ভাবনা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। এর প্রধান কারণগুলো হলো:
স্বচ্ছ ভাবমূর্তি: বড় দলগুলোর বিরুদ্ধে যখন দুর্নীতি ও দখলের অভিযোগ তুঙ্গে, তখন বাম প্রার্থীদের ব্যক্তিগত সততা ভোটারদের আকর্ষণ করছে।
কর্মসূচিভিত্তিক রাজনীতি: কর্মসংস্থান, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং রাষ্ট্রীয় সংস্কারের দাবিতে তাদের সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি শিক্ষিত তরুণদের মধ্যে জনপ্রিয়তা পাচ্ছে।
সংখ্যালঘু ও নারী ভোটারদের সংহতি: এই বিশাল ভোটব্যাংক এবার প্রগতিশীল শক্তির দিকে ঝুঁকে পড়ার প্রবল ইঙ্গিত দিচ্ছে।
শেষ কথা: বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসে লাল পতাকার উপস্থিতি সবসময়ই শোষিত মানুষের কণ্ঠস্বর হিসেবে কাজ করেছে। কিন্তু ২০২৬-এর এই নির্বাচন কেবল কণ্ঠস্বর হওয়ার লড়াই নয়, বরং রাষ্ট্র পরিচালনায় নিজেদের অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করার লড়াই। ডা. মণীষা চক্রবর্তী ও ইঞ্জিনিয়ার শম্পা বসুর মতো লড়াকু নেত্রীদের হাত ধরে বাংলাদেশ কি এক নতুন ভোরের দেখা পাবে? উত্তর পেতে আমাদের তাকিয়ে থাকতে হবে ১২ ফেব্রুয়ারির ব্যালট বক্সের দিকে।


