মুম্বাই/বারামতী: গত ২৮ জানুয়ারি ২০২৬, বুধবার। বিকেলবেলা মুম্বাই থেকে বারামতীর উদ্দেশ্যে রওনা হওয়া একটি লিয়ারজেট ৪৫ (Learjet 45) ব্যক্তিগত বিমান অবতরণের ঠিক আগমুহূর্তে বিধ্বস্ত হয়। বিমানে ছিলেন মহারাষ্ট্রের প্রভাবশালী নেতা ও উপ-মুখ্যমন্ত্রী অজিত পওয়ারসহ তাঁর চারজন ঘনিষ্ঠ কর্মী ও ক্রু সদস্য। দুর্ঘটনায় বিমানে থাকা পাঁচজনই প্রাণ হারান। প্রাথমিক রিপোর্টে খারাপ দৃশ্যমানতা ও যান্ত্রিক ত্রুটির কথা বলা হলেও, তিন সপ্তাহ পেরিয়ে পরিস্থিতি এখন সম্পূর্ণ ভিন্ন দিকে মোড় নিয়েছে।
ব্ল্যাক বক্স ও তদন্তের জটিলতা
এয়ারক্রাফ্ট এক্সিডেন্ট ইনভেস্টিগেশন ব্যুরো (AAIB) তদন্ত শুরু করলেও তারা বড়সড় বাধার মুখে পড়েছে। দুর্ঘটনার পর বিমানে লাগা ভয়াবহ আগুনে বিমানের 'ব্ল্যাক বক্স' (Flight Data Recorder) মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে পাইলটের শেষ মুহূর্তের কথোপকথন বা বিমানের কারিগরি ডেটা উদ্ধার করা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই ধোঁয়াশাই জন্ম দিয়েছে অজস্র ষড়যন্ত্র তত্ত্বের।
রোহিত পওয়ারের বিস্ফোরক তথ্য ও অন্তর্ঘাতের অভিযোগ
এনসিপি (এসপি) বিধায়ক এবং অজিত পওয়ারের আত্মীয় রোহিত পওয়ার এই দুর্ঘটনাকে 'পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড' বা অন্তর্ঘাত হিসেবে দাবি করে মহারাষ্ট্রের রাজনীতিতে ঝড় তুলেছেন। তাঁর তোলা মূল অভিযোগগুলো হলো:
ট্রান্সপন্ডার রহস্য: বিমানটি আছড়ে পড়ার ঠিক এক মিনিট আগে সেটির ট্রান্সপন্ডার (যা দিয়ে বিমানের অবস্থান শনাক্ত করা হয়) রহস্যজনকভাবে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।
পাইলট বদল: নির্ধারিত পাইলট ট্র্যাফিকের কারণে আসতে পারেননি—এই অজুহাতে শেষ মুহূর্তে ক্যাপ্টেন সুমিত কাপুরকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। এই দ্রুত পরিবর্তন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন রোহিত।
অস্বাভাবিক গতিবিধি: প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি অনুযায়ী, বিমানটি অবতরণের আগে আকাশে অদ্ভুত শব্দ করছিল এবং অস্বাভাবিকভাবে ৩৬০-ডিগ্রি চক্কর দিচ্ছিল।
ভিএসআর ভেঞ্চারস-এর প্রভাব: বিমান পরিচালনাকারী সংস্থা ভিএসআর এভিয়েশনের সঙ্গে প্রভাবশালী মহলের ঘনিষ্ঠতা এবং তাদের রক্ষণাবেক্ষণ লগের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।
রাজনৈতিক মহলে তোলপাড় ও নিরাপত্তার দাবি
রোহিত পওয়ারের এই সব অভিযোগের পর তাঁর নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েছেন এনসিপি (এসপি) নেত্রী সুপ্রিয়া সুলে। তিনি মুখ্যমন্ত্রী একনাথ শিন্ডের কাছে রোহিতের জন্য বিশেষ নিরাপত্তার আবেদন জানিয়েছেন। সুলের দাবি, রোহিত জনগণের মনের সংশয়গুলোই প্রকাশ্যে আনছেন, যা কিছু মহলের জন্য অস্বস্তিকর হতে পারে।
এদিকে, অজিত পওয়ারের ছেলে জয় পওয়ার সরাসরি অন্তর্ঘাতের কথা না বললেও, ভিএসআর এয়ারলাইন্সকে নিষিদ্ধ করার দাবি জানিয়েছেন এবং একটি উচ্চপর্যায়ের স্বচ্ছ তদন্ত চেয়েছেন। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং শিবসেনা নেতা সঞ্জয় রাউত এই ঘটনায় বিজেপির দিকে পরোক্ষ ইঙ্গিত করে সুপ্রিম কোর্টের তত্ত্বাবধানে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। রাউতের দাবি, এনসিপি-র একীভূতকরণ নিয়ে বিজেপির পক্ষ থেকে অজিত পওয়ারের ওপর প্রচণ্ড চাপ ছিল।
বর্তমান পরিস্থিতি
যদিও কেন্দ্রীয় মন্ত্রী রামদাস আঠাওয়ালে এবং খোদ এনসিপি প্রধান শরদ পওয়ার এটিকে দুর্ঘটনা হিসেবেই দেখার পক্ষপাতী, তবুও মহারাষ্ট্রের সাধারণ মানুষের মধ্যে সন্দেহ দানা বাঁধছে। সামনেই স্থানীয় নির্বাচন (Zilla Parishad), তার আগে এই ট্র্যাজেডি এনসিপি-র দুই শিবিরের ফাটলকে আরও প্রকট করে তুলেছে। মহারাষ্ট্র সিআইডি (CID) এবং এএআইবি (AAIB) বর্তমানে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে, তবে সত্য উদ্ঘাটন হবে কি না—তা নিয়ে সংশয় রয়েই গেছে।


