নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের ঢাকে কাঠি পড়ে গিয়েছে। বৃহস্পতিবার রাজ্য বিধানসভায় ৪.০৬ লক্ষ কোটি টাকার অন্তর্বর্তীকালীন বাজেট পেশ করার সময় অর্থমন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য সামাজিক সুরক্ষায় একগুচ্ছ ‘উপহার’ দিয়েছেন। যার মধ্যে অন্যতম ছিল রাজ্যের প্রায় ৭০ হাজার আশাকর্মীর (ASHA Workers) ভাতা বৃদ্ধি। কিন্তু সরকারের এই ঘোষণাকে ঘিরে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক। একদিকে সরকার যখন একে ‘মাস্টারস্ট্রোক’ বলছে, অন্যদিকে আশাকর্মীদের একাংশ একে ‘ভোটের আগে ভিক্ষা’ বলে অভিহিত করে ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন।
বাজেটে আশাকর্মীদের জন্য কী কী রয়েছে?
বৃহস্পতিবারের বাজেটে অর্থমন্ত্রী ঘোষণা করেছেন:
ভাতা বৃদ্ধি: ২০২৬ সালের এপ্রিল মাস থেকে আশাকর্মীদের মাসিক সাম্মানিক ভাতা ১,০০০ টাকা বৃদ্ধি করা হবে। বর্তমানে তাঁরা ৫,২৫০ টাকা ভাতা পান, যা বেড়ে হবে ৬,২৫০ টাকা।
মাতৃত্বকালীন ছুটি: সাধারণ সরকারি কর্মীদের মতোই আশাকর্মীরাও এখন থেকে ১৮০ দিনের সবেতন মাতৃত্বকালীন ছুটি পাবেন।
বিমা ও ক্ষতিপূরণ: ডিউটিরত অবস্থায় ৬০ বছর বয়সের আগে কোনো কর্মীর মৃত্যু হলে, তাঁর নিকটাত্মীয়কে এককালীন ৫ লক্ষ টাকা আর্থিক সাহায্য দেওয়া হবে।
কেন অসন্তুষ্ট আশাকর্মীরা?
সরকারের এই ‘কল্পতরু’ অবতার সত্ত্বেও খুশি নন আন্দোলনরত আশাকর্মীরা। তাঁদের দাবি ও ক্ষোভের মূল কারণগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
১. দাবির তুলনায় নগন্য বৃদ্ধি:
দীর্ঘদিন ধরে আশাকর্মীরা মাসিক ন্যূনতম ১৫,০০০ থেকে ২১,০০০ টাকা বেতনের দাবিতে আন্দোলন করছেন। জানুয়ারি মাসজুড়ে সল্টলেকের স্বাস্থ্যভবন অভিযানে তাঁরা পুলিশের বাধার সম্মুখীন হয়েছিলেন, এমনকি অনেকে আটকও হয়েছিলেন। আন্দোলনকারীদের বক্তব্য, "যেখানে বাজারদর আকাশছোঁয়া, সেখানে ১,০০০ টাকা বৃদ্ধি আমাদের সঙ্গে পরিহাস ছাড়া আর কিছু নয়।"
২. ‘সেচ্ছাসেবী’ বনাম ‘সরকারি কর্মী’:
আশাকর্মীদের প্রধান দাবি ছিল তাঁদের ‘স্বেচ্ছাসেবী’ তকমা ঘুচিয়ে রাজ্য সরকারি কর্মীর মর্যাদা দিতে হবে। কিন্তু বাজেটে তাঁদের সেই স্থায়ী পদের দাবিতে কোনো সিলমোহর দেওয়া হয়নি। আন্দোলনরত এক নেত্রীর কথায়, "আমরা শুধু ভাতা চাইনি, আমরা সম্মানের অধিকার চেয়েছিলাম। এই ১,০০০ টাকা দিয়ে আমাদের মুখ বন্ধ করা যাবে না।"
৩. বঞ্চনার অভিযোগ:
বাজেটে সিভিক ভলান্টিয়ার, প্যারা-টিচার এবং অঙ্গনওয়াড়ি কর্মীদেরও একই হারে (১,০০০ টাকা) ভাতা বাড়ানো হয়েছে। আশাকর্মীদের অভিযোগ, গ্রামীণ স্বাস্থ্য ব্যবস্থার পুরো ভার তাঁদের কাঁধে থাকলেও এবং কোভিডের মতো অতিমারিতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করলেও তাঁদের বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।
রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া ও আগামীর পথ
মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই বাজেটকে ‘জনমুখী’ বলে দাবি করেছেন। তাঁর মতে, কেন্দ্রীয় সরকার টাকা আটকে রাখা সত্ত্বেও রাজ্য সরকার সীমিত ক্ষমতার মধ্যে থেকে স্বাস্থ্যকর্মীদের কথা ভেবেছে। অন্যদিকে, বিরোধী দলগুলো একে ‘ভোট কেনার বাজেট’ বলে কটাক্ষ করেছে।
আশাকর্মী সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই সামান্য বৃদ্ধিতে তাঁরা কর্মবিরতি বা আন্দোলন প্রত্যাহার করবেন না। বরং বাজেটের পর জেলা স্তরে তাঁরা বড় ধরনের আন্দোলনের রূপরেখা তৈরি করছেন। তাঁদের হুঁশিয়ারি, দাবি পূরণ না হলে ছাব্বিশের নির্বাচনে এর প্রভাব পড়বে ব্যালট বক্সে।
ভোটের মুখে লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের বরাদ্দ বৃদ্ধি বা নতুন ‘যুব সাথী’ প্রকল্পের মাধ্যমে সরকার যখন সব পক্ষকে খুশি করতে চাইছে, তখন আশাকর্মীদের এই অসন্তোষ প্রশাসনের জন্য অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ১,০০০ টাকার এই বৃদ্ধি শেষ পর্যন্ত ‘আশা’ জাগাতে পারবে কি না, তা সময়ই বলবে।


