নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: বামপন্থী রাজনীতিতে ব্যক্তির চেয়ে আদর্শ এবং সমষ্টিগত সিদ্ধান্তই শেষ কথা। সম্প্রতি তরুণ নেতা প্রতীকুর রহমানের দলত্যাগ এবং দলের রাজ্য নেতৃত্বের বিরুদ্ধে তাঁর কড়া মন্তব্যকে এই দৃষ্টিকোণ থেকেই দেখছে সিপিআইএম। আলিমুদ্দিন স্ট্রিট সূত্রের খবর, প্রতীকুরের এই আচরণ আসলে আদর্শগত বিচ্যুতি এবং ব্যক্তিগত রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে চরিতার্থ করার একটি প্রচেষ্টা মাত্র।
ব্যক্তিপূজা বনাম গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতা
দলীয় নেতৃত্বের একাংশের মতে, প্রতীকুর রহমান সংবাদমাধ্যমে যে ‘একনায়কতন্ত্রের’ অভিযোগ তুলেছেন, তা কমিউনিস্ট পার্টির মূল ভিত্তি ‘গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতা’ (Democratic Centralism) সম্পর্কে তাঁর অজ্ঞতা বা সজ্ঞানে বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা। পার্টিতে প্রশ্ন করার অধিকার সবার থাকলেও, সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর তা মেনে চলাই হলো শৃঙ্খলা। প্রতীকুর সেই শৃঙ্খলা ভেঙে জনসমক্ষে নেতৃত্বকে আক্রমণ করে আসলে বুর্জোয়া রাজনীতিরই অনুকরণ করছেন।
লক্ষ্মীর ভাণ্ডার ও সুবিধাবাদী তত্ত্ব
লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রকল্প নিয়ে প্রতীকুর রহমান যে প্রশ্ন তুলেছেন, তার উত্তরে বামপন্থী তাত্ত্বিকদের দাবি—মানুষের অধিকার এবং খয়রাতি সাহায্যের মধ্যে পার্থক্য বুঝতে ব্যর্থ হয়েছেন তিনি। বামপন্থীরা সবসময়ই মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধির কথা বলে, কিন্তু তা যেন সস্তা ভোটব্যাঙ্ক তৈরির হাতিয়ার না হয়। প্রতীকুর যেভাবে তৃণমূলের প্রকল্পের প্রশংসা বা নমনীয় সুর শোনাচ্ছেন, তাতে তাঁর ‘আদর্শগত স্খলন’ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল।
বিদ্রোহ না কি দলবদলের জমি তৈরি?
মোহাম্মদ সেলিমকে ‘গব্বর সিং’-এর সাথে তুলনা করা বা দলের অন্দরে ভয়ের পরিবেশের যে দাবি প্রতীকুর করেছেন, তাকে গুরুত্ব দিতে নারাজ রাজ্য কমিটি। দলের ক্যাডারদের বড় অংশের মতে:
নির্বাচনী টিকিট না পাওয়া বা ব্যক্তিগত গুরুত্ব কমে যাওয়াই এই ক্ষোভের আসল কারণ।
বিগত কয়েক মাস ধরে তাঁর কার্যকলাপে দলের নীতির চেয়ে ব্যক্তিগত প্রচারের আধিক্য দেখা যাচ্ছিল।
তৃণমূলে যোগদানের জল্পনা জিইয়ে রাখা প্রমাণ করে যে, তিনি আসলে আদর্শের লড়াই ছেড়ে ক্ষমতার অলিন্দে জায়গা খুঁজছেন।
নেতৃত্বের প্রতিক্রিয়া
মোহাম্মদ সেলিম বা দলের শীর্ষ নেতৃত্ব প্রতীকুরকে নিয়ে বাড়তি কথা বলে তাঁকে গুরুত্ব দিতে চাননি। দলীয় সূত্রে খবর, গতকালের রাজ্য কমিটির বৈঠকে স্থির হয়েছে যে, যারা পার্টির কঠিন সময়ে লড়াই ছেড়ে শাসকদলের হাত শক্ত করার ইঙ্গিত দেয়, তাদের নিয়ে সময় নষ্ট করার প্রয়োজন নেই।
সিপিআইএম-এর দীর্ঘ ইতিহাস বলছে, ব্যক্তি চলে গেলেও আদর্শের লড়াই থেমে থাকে না। প্রতীকুর রহমানের এই প্রস্থানকে দল একটি ‘শুদ্ধিকরণ’ হিসেবেই দেখছে, যেখানে লড়াইয়ের ময়দান ছেড়ে সুবিধাবাদীদের বিদায় অনিবার্য ছিল।


