নিজস্ব প্রতিনিধি, দুর্গাপুর:
২১শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬। ক্যালেন্ডারের পাতায় একটি তারিখ মাত্র নয়, বরং এক জাতির অস্তিত্বের দর্পণ। যখন চারদিকে ভাষা-সন্ত্রাস আর অসহিষ্ণুতার কালো মেঘ ঘনীভূত হচ্ছে, যখন নিজের শিকড় ভুলে যাওয়ার এক অসুস্থ প্রতিযোগিতায় মেতেছে আধুনিক সমাজ— ঠিক তখনই শিল্পনগরী দুর্গাপুর দেখাল এক অনন্য আলোর দিশা। প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে এক দীর্ঘস্থায়ী লড়াইয়ের শপথ নিয়ে আজ মেতে উঠল আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উদযাপন কমিটি, দুর্গাপুর।
শহীদ বেদীতে হৃদয়ের অর্ঘ্য
ভোরের শিশিরভেজা ঘাসে যখন সূর্যোদয়ের প্রথম কিরণ এসে পড়ল, তখনই দুর্গাপুরের বি-জোনের 'ভাষা শহীদ স্মারক উদ্যান' হয়ে উঠল এক পুণ্যতীর্থ। সালাম, বরকত, রফিকদের সেই অমর আত্মত্যাগকে স্মরণ করে মাল্যদান ও বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলির মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। সমবেত কণ্ঠে যখন বেজে উঠল একুশের গান, তখন উপস্থিত সাধারণ মানুষের চোখে ফুটে উঠেছিল এক অমোঘ তৃপ্তি।
সীমানা ভাঙা ভাষার মিলনমেলা
এবারের আয়োজনে কেবল বাংলা নয়, বরং ভারতবর্ষের বহুত্ববাদী সংস্কৃতির এক অপূর্ব প্রতিফলন দেখা গেল।
একদিকে যেমন ছিল হিন্দি সাহিত্যের বলিষ্ঠ উপস্থাপনা, ঠিক তেমনি অন্যপ্রান্তে শোনা গেল আদিবাসী হৃদয়ের স্পন্দন— অলচিকি ভাষার অনবদ্য কবিতা পাঠ।
ভাষার এই বৈচিত্র্য প্রমাণ করে দিল যে, একুশ কেবল একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের নয়, বরং তা বিশ্বের প্রতিটি কোণায় লড়াই করা মাতৃভাষার প্রতীক।
এই বহুভাষিক মেলবন্ধন উপস্থিত দর্শকদের মধ্যে এক অদ্ভুত অনুপ্রেরণা জোগায়, যা বর্তমান সময়ের বিভেদের রাজনীতির মুখে এক জোরালো চপেটাঘাত।
শিল্পীর তুলিতে প্রতিবাদের ভাষা
অনুষ্ঠানের অন্যতম মূল আকর্ষণ ছিল 'আর্টিস্ট ফোরাম সিক্স ডাইমেনশন'-এর শিল্পীদের উপস্থিতি। যখন মঞ্চে একক কবিতা, গীতি আলেখ্য আর ছান্দিক নৃত্যের ঝংকার বইছিল, তখন উদ্যানের এক কোণে বসে শিল্পীরা তাঁদের তুলির টানে সাদা ক্যানভাসে ফুটিয়ে তুলছিলেন প্রতিরোধের প্রতিচ্ছবি। রঙের আঁচড়ে তাঁরা বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন যে, শিল্পই পারে সমাজের এই অস্থির সময়ে সঠিক পথ দেখাতে।
সাংস্কৃতিক লহরী ও নক্ষত্র সমাবেশ
শহরের দিকপাল সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলির সমাগমে অনুষ্ঠানটি পূর্ণতা পায়:
সাহিত্যিক দীপক দেব-এর হাত ধরে অনুষ্ঠানের শুভ সূচনা হয়।
বিশিষ্ট অতিথি হিসেবে বিদ্যাসাগর মডেল স্কুলের প্রধান শিক্ষক সুচিন্ত চট্টরাজ তাঁর সুচিন্তিত ও তপ্ত বক্তব্যে মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার আবেদন জানান।
লহরী দুর্গাপুর, কথামালা এবং দুর্গাপুর আড্ডা ইয়ং অ্যাসোসিয়েশন-এর মতো সংগঠনগুলির সক্রিয় অংশগ্রহণ অনুষ্ঠানটিকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়।
লেখক শিল্পী সংঘ (ইস্পাত শাখা)-এর পক্ষ থেকে আয়োজিত বইয়ের উদ্বোধন অনুষ্ঠানটি ছিল জ্ঞানপিপাসু পাঠকদের জন্য এক বাড়তি পাওনা।
দুর্গাপুরের এই মাটি আজ শুধু লোহার নয়, বরং শিল্পের তপ্ত আঁচে নতুন করে গড়া হলো। হিন্দি, অলচিকি আর বাংলার এই অপূর্ব সহাবস্থান প্রমাণ করল যে, মাতৃভাষা কোনো বিভেদ জানে না, সে শুধু জানে ভালোবাসার জোরে প্রতিকূলতাকে জয় করতে।





















