২০১০ সালের ১২ জানুয়ারি হাইতিতে আঘাত হানা ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর দেশটিকে আবার দাঁড় করাতে সবচেয়ে বড় নামগুলোর একটি ছিল ক্লিনটন ফাউন্ডেশন। বিল ক্লিনটন নিজে হাইতি সরকারের অনুরোধে 'ইন্টারিম হাইতি রিকভারি কমিশন' (IHRC)-এর কো-চেয়ার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
১. ক্লিনটন ফাউন্ডেশনের প্রত্যক্ষ ভূমিকা ও সহায়তা
ক্লিনটন ফাউন্ডেশন এবং ক্লিনটন গ্লোবাল ইনিশিয়েটিভ (CGI) হাইতির উন্নয়নে প্রায় ৫০ কোটি ডলারের বেশি প্রতিশ্রুতি ও সহায়তা নিশ্চিত করেছিল।
কৃষি ও পরিবেশ: ফাউন্ডেশনের সহায়তায় প্রায় ৭,৫০০ কৃষক উপকৃত হয় এবং ৫ মিলিয়নেরও বেশি গাছ লাগানো হয়।
জরুরি সহায়তা: 'ক্লিনটন-বুশ হাইতি ফান্ড'-এর মাধ্যমে তাৎক্ষণিক ত্রাণ ও গৃহহীনদের আশ্রয়ের জন্য কাজ করা হয়।
উন্নয়ন প্রকল্প: বিল ক্লিনটনের নেতৃত্বাধীন কমিশন প্রায় ৭০টির বেশি বড় প্রকল্প অনুমোদন করে যার মধ্যে আবাসন, স্বাস্থ্য এবং ধ্বংসস্তূপ পরিষ্কারের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল।
২. বিতর্ক ও অব্যবস্থাপনার অভিযোগ
বিপুল পরিমাণ অর্থের প্রবাহ থাকলেও হাইতির সাধারণ মানুষের মধ্যে অসন্তোষ দানা বাঁধে। সমালোচকদের অভিযোগ ছিল:
মন্থর গতি: কমিশনের অনুমোদিত কোটি কোটি ডলারের মাত্র একটি ক্ষুদ্র অংশ (প্রায় ৩.৭%) নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে খরচ করা সম্ভব হয়েছিল।
স্বার্থ সংঘাত: অভিযোগ ওঠে যে, ক্লিনটন ফাউন্ডেশনের বড় দাতাদের কোম্পানিগুলোকে হাইতির পুনর্গঠন কাজে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছিল।
ব্যর্থ প্রজেক্ট: কারাকল ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের (Caracol Industrial Park) মতো মেগা প্রজেক্টগুলো হাইতির অর্থনীতির আমূল পরিবর্তন করার কথা থাকলেও, সেগুলো প্রত্যাশিত সাফল্য পায়নি।
৩. শিশু পাচার বিতর্ক ও লরা সিলসবি কাণ্ড
হাইতি নিয়ে ক্লিনটন পরিবারকে জড়িয়ে অন্যতম চাঞ্চল্যকর দাবি হলো শিশু পাচারের অভিযোগ। তবে বিস্তারিত তদন্তে যা পাওয়া গেছে:
লরা সিলসবি কেস: ২০১০ সালে লরা সিলসবি নামক এক মার্কিন মিশনারি ৩৩ জন হাইতিয়ান শিশুকে অবৈধভাবে সীমান্ত পার করার চেষ্টার অভিযোগে গ্রেফতার হন। এটি সম্পূর্ণ আলাদা একটি ঘটনা ছিল।
ক্লিনটন সংযোগ: বিল ক্লিনটন সেই সময় মার্কিন নাগরিকদের মুক্তি নিশ্চিত করতে কূটনীতিক তৎপরতা চালিয়েছিলেন, যা পরে ষড়যন্ত্র তত্ত্বের (Conspiracy Theory) জন্ম দেয়। তবে ক্লিনটন ফাউন্ডেশন বা বিল ক্লিনটনের সাথে এই পাচার চেষ্টার কোনো সাংগঠনিক বা ব্যক্তিগত প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
পরিবারগুলোর দাবি: জানা গেছে, ওই ৩৩ জন শিশুর অধিকাংশই এতিম ছিল না; দারিদ্র্যের কারণে তাদের বাবা-মায়েরা উন্নত শিক্ষার আশায় সিলসবির হাতে সন্তানদের তুলে দিয়েছিলেন।
৪. হাইতির বর্তমান চিত্র (২০২৫-২০২৬): আধুনিক দাসত্ব ও গ্যাং কালচার
২০২৬ সালের বর্তমান রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে, হাইতিতে শিশু পাচার এবং শোষণ এখনো একটি ভয়াবহ সমস্যা, তবে এর কারণগুলো সম্পূর্ণ ভিন্ন।
গ্যাং নিয়ন্ত্রণ: বর্তমানে হাইতির রাজধানী পোর্ট-অ-প্রিন্সের প্রায় ৮০% এলাকা সশস্ত্র গ্যাংদের দখলে। তারা শিশুদের যোদ্ধা হিসেবে এবং মেয়েদের যৌন দাসী হিসেবে ব্যবহার করছে।
রেস্তাভেক (Restavèk) সিস্টেম: চরম দারিদ্র্যের কারণে প্রায় ১.৫ লাখ থেকে ৩ লাখ শিশু বর্তমানে অন্য মানুষের বাড়িতে গৃহকর্মী হিসেবে অমানবিক পরিশ্রম করতে বাধ্য হচ্ছে, যা এক ধরনের আধুনিক দাসত্ব।
ফ্যাক্ট চেক: ওয়াশিংটন পোস্ট এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক অডিট রিপোর্ট অনুযায়ী, ক্লিনটন ফাউন্ডেশনের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত লাভের কোনো অকাট্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে দাতা দেশগুলোর প্রভাব এবং স্থানীয় সরকারকে পাশ কাটিয়ে কাজ করার ফলে হাইতির স্থায়ী উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।


