বিশেষ প্রতিবেদন | ২০২৬
ভারত বর্তমানে বিশ্বের বৃহত্তম ‘অভিবাসী সরবরাহকারী’ দেশ। প্রতি বছর প্রায় ২৫ লাখ ভারতীয় নাগরিক ব্যাগ গুছিয়ে বিদেশের উদ্দেশ্যে রওনা হন। এর মধ্যে যেমন রয়েছেন নির্মাণ শ্রমিক, তেমনি রয়েছেন অত্যন্ত মেধাবী শিক্ষার্থী এবং বিশ্বসেরা আইটি ইঞ্জিনিয়ার। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অভিবাসনের এই স্রোতে বড় পরিবর্তন এসেছে। এখন কেবল টিকে থাকার লড়াই নয়, বরং ‘উন্নত জীবনযাত্রা’ এবং ‘স্থায়ী নাগরিকত্ব’ পাওয়াই হয়ে উঠেছে মূল লক্ষ্য।
১. স্টুডেন্ট টু পিআর (Student to PR): উচ্চশিক্ষার আড়ালে স্থায়ী বসবাসের স্বপ্ন
বর্তমানে ভারত থেকে বিদেশে পড়তে যাওয়া কেবল ডিগ্রি অর্জনের বিষয় নয়, এটি স্থায়ীভাবে বিদেশে থিতু হওয়ার একটি নিশ্চিত পথ।
শিক্ষার্থী থেকে নাগরিক: কানাডা, অস্ট্রেলিয়া এবং যুক্তরাজ্যের মতো দেশগুলো এখন ভারতীয় শিক্ষার্থীদের প্রধান লক্ষ্য। এর কারণ হলো 'টু-স্টেপ মাইগ্রেশন'। শিক্ষার্থীরা প্রথমে কয়েক কোটি টাকা খরচ করে উচ্চশিক্ষা নিতে যান, যার মূল উদ্দেশ্য থাকে পড়াশোনা শেষে 'পোস্ট-গ্রাজুয়েশন ওয়ার্ক পারমিট' পাওয়া।
আর্থিক চাপ ও বাস্তবতা: তবে এই পথটি এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং। ২০২৪-২৫ সালের পর থেকে কানাডার মতো দেশে আবাসন সংকট এবং জীবনযাত্রার ব্যয় প্রচণ্ড বৃদ্ধি পেয়েছে। অনেক ভারতীয় শিক্ষার্থীকে এখন পড়াশোনার পাশাপাশি একাধিক পার্ট-টাইম কাজ করতে হচ্ছে শুধু ডাল-ভাতের সংস্থান করতে। তাসত্ত্বেও, ভারতের তুলনায় উন্নত সামাজিক নিরাপত্তা এবং স্বাস্থ্যসেবার লোভে এই প্রবাহ কমছে না।
২. আইটি পেশাদার: গ্লোবাল টেক হাবে ভারতের আধিপত্য
ভারতের আইটি পেশাদাররা এখন আর শুধু আমেরিকার H-1B ভিসার ওপর নির্ভরশীল নন। তারা এখন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ছেন।
আমেরিকা বনাম ইউরোপ: দীর্ঘ সময় ধরে আমেরিকা ছিল আইটি কর্মীদের স্বর্গরাজ্য। কিন্তু গ্রিন কার্ড পাওয়ার দীর্ঘ প্রতীক্ষা (যা অনেক ক্ষেত্রে ১০-২০ বছর পর্যন্ত হতে পারে) অনেক দক্ষ কর্মীকে হতাশ করছে। এর বিপরীতে জার্মানি, নেদারল্যান্ডস এবং ফিনল্যান্ডের মতো দেশগুলো ‘ব্লু কার্ড’ বা বিশেষ টেক-ভিসার মাধ্যমে অনেক দ্রুত স্থায়ী বসবাসের সুযোগ দিচ্ছে।
ডিজিটাল নোম্যাড ও রিমোট ওয়ার্ক: প্রযুক্তির উন্নতির ফলে অনেক ভারতীয় আইটি বিশেষজ্ঞ এখন ‘ডিজিটাল নোম্যাড’ হিসেবে কাজ করছেন। তারা ইউরোপ বা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে বসবাস করে মার্কিন বা ইউরোপীয় কোম্পানির হয়ে কাজ করছেন, যা তাদের জীবনযাত্রার মান বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
৩. মধ্যপ্রাচ্য বনাম পশ্চিমা দেশ: দুই ভিন্ন বাস্তবতা
ভারতীয় অভিবাসীদের সাফল্যের সমীকরণ দেশভেদে ভিন্ন হয়। নিচে একটি তুলনামূলক চিত্র দেওয়া হলো:
| ক্যাটাগরি | সংযুক্ত আরব আমিরাত / সৌদি আরব (Gulf) | কানাডা / আমেরিকা / ইউরোপ (West) |
| মূল পেশা | নির্মাণ, সেবা খাত ও মধ্যম সারির ম্যানেজমেন্ট। | আইটি, স্বাস্থ্যসেবা, গবেষণা ও প্রকৌশল। |
| নাগরিকত্ব | আজীবন কাজ করলেও নাগরিকত্ব পাওয়া প্রায় অসম্ভব। | ৩ থেকে ৫ বছর পর স্থায়ী নাগরিকত্বের সুযোগ। |
| পরবর্তী প্রজন্ম | সন্তানদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত (নাগরিকত্ব নেই)। | সন্তানরা স্থানীয় নাগরিক হিসেবে সমান সুযোগ পায়। |
| আয়ের ধরন | করমুক্ত উচ্চ বেতন, বড় অংকের রেমিট্যান্স পাঠানো যায়। | উচ্চ কর ব্যবস্থা, কিন্তু উন্নত সামাজিক ও চিকিৎসা সুরক্ষা। |
৪. মেধা পাচার নাকি মেধা লাভ (Brain Drain vs Brain Gain)?
ভারতের জন্য এই বিশাল অভিবাসন একটি দ্বিমুখী তলোয়ারের মতো। একদিকে প্রতি বছর বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের রেমিট্যান্স দেশে আসছে, যা ভারতের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে শক্তিশালী করছে। অন্যদিকে, আইআইটি (IIT) বা আইআইএম (IIM)-এর মতো প্রথম সারির প্রতিষ্ঠানের মেধাবীরা দেশ ছাড়ায় ভারত তার সেরা উদ্ভাবকদের হারাচ্ছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা একে এখন 'ব্রেইন সার্কুলেশন' বলছেন। কারণ অনেক প্রবাসী কয়েক বছর পর অভিজ্ঞতা ও পুঁজিসহ দেশে ফিরে স্টার্টআপ শুরু করছেন, যা ভারতের অর্থনীতিতে নতুন গতি আনছে।


