নিজস্ব প্রতিবেদক, বেঙ্গালুরু ও নয়াদিল্লি শনিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
ভারতে নারী শ্রমশক্তির অংশগ্রহণ বৃদ্ধির সাথে সাথে কর্মক্ষেত্রে তাঁদের স্বাস্থ্যগত সুরক্ষা নিশ্চিত করার দাবি জোরালো হচ্ছে। কর্ণাটক সরকারের সাম্প্রতিক 'মাসিককালীন ছুটি' (Menstrual Leave) নীতি এই দাবিকে ঘিরে একটি তীব্র আইনি ও সামাজিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। একদিকে প্রগতিশীল সামাজিক সংস্কার, অন্যদিকে নিয়োগকর্তাদের আইনি আপত্তি—এই দুইয়ের দোলাচলে ভারতের কর্মক্ষেত্র এখন এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে।
১. কর্ণাটকের 'গেম-চেঞ্জার' নীতি ও বর্তমান অচলাবস্থা
২০২৫ সালের শেষার্ধে কর্ণাটক মন্ত্রিসভা 'Menstrual Leave Policy 2025' অনুমোদন করে। এর আওতায় ১৮ থেকে ৫২ বছর বয়সী নারী কর্মীদের জন্য প্রতি মাসে একদিনের সপেমেন্ট (Paid) ছুটির বিধান রাখা হয়। এটি ভারতের ইতিহাসে একটি বিশেষ মাইলফলক, কারণ প্রথমবারের মতো কোনো রাজ্য সরকার সরকারি দপ্তরের পাশাপাশি আইটি সেক্টর, বহুজাতিক কোম্পানি (MNC) এবং পোশাক শিল্পের মতো বৃহৎ বেসরকারি ক্ষেত্রকেও এই আইনের আওতায় আনার চেষ্টা করেছে।
তবে, বর্তমানে এই উদ্যোগটি বড় ধরনের আইনি বাধার মুখে পড়েছে। ব্যাঙ্গালোর হোটেল অ্যাসোসিয়েশন এবং বেশ কিছু বেসরকারি সংস্থা কর্ণাটক হাইকোর্টে রিট পিটিশন দাখিল করেছে। তাদের দাবি, যথাযথ কেন্দ্রীয় শ্রম আইনের সংশোধন ছাড়াই কেবল নির্বাহী আদেশের (Executive Order) মাধ্যমে এই ধরনের বাধ্যবাধকতা আরোপ করা অসাংবিধানিক। বর্তমানে এই নীতির ওপর হাইকোর্টের স্থগিতাদেশ বলবৎ রয়েছে, যা নিয়ে দেশব্যাপী শ্রমিক অধিকার গোষ্ঠীগুলো উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
২. ইতিহাস ও জাতীয় প্রেক্ষাপট: বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ থেকে সামগ্রিক দাবি
ঋতুস্রাবকালীন ছুটির ধারণা ভারতে নতুন নয়, তবে এর বাস্তবায়ন ছিল অত্যন্ত ধীর এবং বিচ্ছিন্ন:
বিহার ও ওড়িশা: ১৯৯২ সাল থেকে বিহারে সরকারি নারী কর্মীরা মাসে দুই দিনের বিশেষ ছুটি পেয়ে আসছেন। ওড়িশাও সম্প্রতি একই পথে হেঁটেছে। তবে এই সুবিধাগুলো কেবল সরকারি কর্মচারীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান: কেরল সরকার বিশ্ববিদ্যালয় ও আইটিআইগুলোতে ছাত্রীদের জন্য মাসিককালীন ছুটির অনুমতি দিয়েছে। এনএলইউ দিল্লি (NLU Delhi) এবং চাণক্য এনএলইউ (CNLU)-র মতো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোও ছাত্রীদের জন্য 'অ্যাটেনডেন্স রিলাক্সেশন' পলিসি চালু করেছে।
বিচার বিভাগীয় নজির: ২০২৪ সালে সিকিম হাইকোর্ট তাদের নারী কর্মচারীদের জন্য মাসে ৩ দিনের ছুটির বিজ্ঞপ্তি দিয়ে এক যুগান্তকারী দৃষ্টান্ত স্থাপন করে।
৩. সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ ও 'মডেল পলিসি'র অপেক্ষা
২০২৪ সালের জুলাই মাসে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট এই বিষয়ে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ দেয়। প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ জানায়, ঋতুস্রাবকালীন ছুটি বাধ্যতামূলক করলে তা নারী কর্মীদের নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রতিকূল প্রভাব ফেলতে পারে। নিয়োগকর্তারা খরচ ও কাজের ধারাবাহিকতা রক্ষায় নারী কর্মীদের পরিবর্তে পুরুষদের নিয়োগে অগ্রাধিকার দিতে পারেন।
আদালত এই বিষয়টিকে 'পলিসি ম্যাটার' হিসেবে ঘোষণা করে এবং কেন্দ্রীয় সরকারকে নির্দেশ দেয় যেন তারা রাজ্য ও অন্যান্য অংশীজনদের সাথে আলোচনা করে একটি 'মডেল মেনস্ট্রুয়াল লিভ পলিসি' তৈরি করে। কেন্দ্রীয় সরকার বর্তমানে এই জাতীয় ফ্রেমওয়ার্কের ওপর কাজ করছে, যা পুরো ভারতের জন্য একটি একক নির্দেশিকা হিসেবে কাজ করবে।
৪. বিতর্কের দুই দিক: অধিকার বনাম কর্মসংস্থানের ঝুঁকি
এই নীতি নিয়ে ভারতের নীতিনির্ধারক ও সমাজকর্মীদের মধ্যে স্পষ্ট বিভাজন দেখা যাচ্ছে:
সমর্থকদের যুক্তি: তাঁরা মনে করেন, ঋতুস্রাবের সময় তীব্র যন্ত্রণাকে (Dysmenorrhea) স্বীকৃতি দেওয়া কোনো করুণা নয়, বরং এটি মানবাধিকার। আর্টিকেল ২১ (জীবন ও মর্যাদার অধিকার) এবং আর্টিকেল ১৫ (বৈষম্যহীনতা)-এর আলোকে এটি নারীর সাংবিধানিক অধিকার। জ়োম্যাটো, সুইগি এবং বাইজুস-এর মতো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো এই ছুটি চালু করে প্রমাণ করেছে যে এতে কর্মক্ষেত্রে উৎপাদনশীলতা কমে না, বরং বাড়ে।
বিরোধীদের উদ্বেগ: সমালোচকদের আশঙ্কা, এটি দীর্ঘমেয়াদে নারীর ক্ষমতায়নের পথে বাধা হতে পারে। বাধ্যতামূলক ছুটি থাকলে ছোট ও মাঝারি শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো নারী কর্মী নিয়োগে অনীহা প্রকাশ করতে পারে (Hiring Bias)। অনেকে মনে করেন, নির্দিষ্ট 'মাসিককালীন ছুটি'র পরিবর্তে জেন্ডার-নিউট্রাল 'অতিরিক্ত স্বাস্থ্য ছুটি' (Health Leave) চালু করা বেশি কার্যকর হতে পারে।
৫. আগামী দিনের পথ: সংসদে ঝুলে থাকা বিল
সংসদে বর্তমানে 'Menstrual Leave and Hygiene Bill, 2024' শীর্ষক একটি প্রাইভেট মেম্বার বিল পাসের অপেক্ষায় রয়েছে। এই বিলে কেবল ছুটির কথা নয়, বরং কর্মক্ষেত্রে স্যানিটারি ন্যাপকিন সরবরাহ এবং ঋতুস্রাবকালীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।


