নয়াদিল্লি, ৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬: ২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ভাগ্য কি শেষ পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্টের এজলাসে নির্ধারিত হবে? বুধবার দেশের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সশরীরে উপস্থিতি এবং সরাসরি সওয়াল এই প্রশ্নটিকেই বড় করে তুলেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, একজন আসীন মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দিল্লির রাজপথ ছেড়ে আদালত কক্ষের ভেতরে আইনি লড়াইয়ে নামার এই ঘটনা ভারতীয় বিচারবিভাগের ইতিহাসে যেমন বিরল, তেমনি রাজনৈতিকভাবেও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
১. সুপ্রিম কোর্টে মমতার মূল আইনি যুক্তি
মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সওয়াল মূলত নির্বাচন কমিশনের (ECI) বিশেষ ভোটার তালিকা সংশোধন বা SIR-এর "অসাংবিধানিক ভিত্তি" নিয়ে। আদালত কক্ষে তিনি যে বিষয়গুলো তুলে ধরেন:
৫8 লক্ষ বনাম ১.৪ কোটি: মুখ্যমন্ত্রী অভিযোগ করেন যে, ইতিমধ্যে প্রায় ৫৮ লক্ষ নাম বাদ দেওয়া হয়েছে এবং 'লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি'র দোহাই দিয়ে আরও প্রায় ১.৩৬ কোটি ভোটারকে বাতিলের তালিকায় রাখা হয়েছে।
স্বচ্ছতার অভাব: আদালত নির্দেশ দেওয়া সত্ত্বেও কমিশন কেন সংশোধিত তালিকা স্থানীয়ভাবে বা অনলাইনে প্রকাশ করেনি, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি।
২০২৫-এর তালিকা বহাল রাখার দাবি: তিনি আদালতের কাছে আবেদন জানান যেন কমিশনকে নির্দেশ দেওয়া হয় যাতে ২০২৫ সালের বিদ্যমান তালিকার ভিত্তিতেই ২০২৬-এর নির্বাচন করা হয়।
২. রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট: 'গিমিক' বনাম 'সংগ্রাম'
এই মামলাটি আদালত কক্ষের বাইরে এক তীব্র রাজনৈতিক যুদ্ধে রূপ নিয়েছে। সমালোচক এবং বিরোধী পক্ষ বিষয়টিকে ভিন্নভাবে দেখছে:
বিরোধীদের তোপ: "পলিটিক্যাল গিমিক":
বিজেপি এবং বিরোধী দলগুলোর দাবি, এটি আসলে পরাজয় নিশ্চিত জেনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি সুপরিকল্পিত "ইলেকশন গিমিক"। তাঁদের অভিযোগ:
ভিক্টিম কার্ড: রাজ্যে নিয়োগ দুর্নীতি ও আই-প্যাক (I-PAC) অফিসে কেন্দ্রীয় সংস্থার তল্লাশি থেকে দৃষ্টি সরাতে তিনি ভোটার তালিকাকে আবেগের ইস্যুতে পরিণত করছেন।
অনুপ্রবেশকারী রক্ষা: বিজেপির দাবি, মুখ্যমন্ত্রী আসলে তাঁর দলের "ভুয়া ভোটার" এবং "অনুপ্রবেশকারী ভোটব্যাঙ্ক" রক্ষা করতেই আধুনিক ও স্বচ্ছ SIR প্রক্রিয়ার বিরোধিতা করছেন।
আদালতকে ব্যবহার: সশরীরে হাজির হওয়াকে বিরোধীরা "পাবলিসিটি স্টান্ট" হিসেবে দেখছেন, যাতে নিজেকে "বাংলার একমাত্র রক্ষাকর্তা" হিসেবে তুলে ধরা যায়।
তৃণমূলের পাল্টা দাবি: "গণতন্ত্রের সংগ্রাম":
অন্যদিকে, তৃণমূল কংগ্রেসের দাবি—এটি কোনো গিমিক নয়, বরং "মানুষের সংগ্রাম"। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ইতিমধ্যে ঘোষণা করেছেন যে, যদি প্রয়োজন হয় তবে তিনি নির্বাচন কমিশনারের অভিশংসন (Impeachment) দাবি করবেন। তাঁদের মতে:
এটি একটি "ডিজিটাল এনআরসি" (Digital NRC), যার মাধ্যমে কয়েক লক্ষ বাঙালির নাম ভোটার তালিকা থেকে মুছে ফেলার ষড়যন্ত্র হচ্ছে।
মুখ্যমন্ত্রী জনসভায় দাঁড়িয়ে বলেছেন, "আমি রাজপথে লড়ছি, প্রয়োজনে আদালতেও লড়ব, কিন্তু বাংলার মানুষের অধিকার কাড়তে দেব না।"
৩. বিচারপতির পর্যবেক্ষণ
শুনানি চলাকালীন বিচারপতি সূর্য কান্ত কমিশনকে প্রশ্ন করেন, "কেন প্রায় ১ কোটি মানুষের ওপর এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অতিরিক্ত মানসিক ও শারীরিক চাপ (Stress and Strain) সৃষ্টি করা হচ্ছে?" তবে কমিশন দাবি করেছে যে, প্রযুক্তির মাধ্যমে তালিকা ত্রুটিমুক্ত করাই তাদের একমাত্র লক্ষ্য।
সুপ্রিম কোর্ট বর্তমানে এই মামলার শুনানি স্থগিত রেখেছে এবং কমিশনকে আরও তথ্য জমা দিতে বলেছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই আইনি সক্রিয়তাকে কেউ দেখছেন 'মরিয়া সংগ্রাম' হিসেবে, আবার কেউ বলছেন এটি শুধুই নির্বাচনের আগে 'রাজনৈতিক গিমিক'। তবে ২০২৬-এর হাই-ভোল্টেজ ভোটের আগে এটিই যে সবচেয়ে বড় নির্বাচনী অস্ত্র হতে চলেছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।


