আজ ৪ ফেব্রুয়ারি, বিশ্ব ক্যান্সার দিবস। এই দিনটি যখন ক্যালেন্ডারের পাতায় ফিরে আসে, তখন তামিলনাড়ুর আকাশজুড়ে এক গুমোট বিষাদ ধরা পড়ে। সরকারি নথির সাদা-কালো অক্ষরে লেখা ১,০০,০৯৭ সংখ্যাটি কোনো সাধারণ পরিসংখ্যান নয়; এটি এক লক্ষ পরিবারের স্বপ্নভঙ্গের আর্তনাদ। ২০২৫ সালে রাজ্যটি প্রথমবারের মতো এক লক্ষ আক্রান্তের সীমা অতিক্রম করেছে—এটি কেবল একটি রেকর্ড নয়, এটি একটি সতর্কবার্তা।
পরিসংখ্যান যখন সংখ্যা ছাড়িয়ে দীর্ঘশ্বাসে পরিণত হয়, তখন তা আর কেবল নথিপত্র থাকে না, হয়ে ওঠে এক একটি পরিবারের ধ্বংসস্তূপ। কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রকের সাম্প্রতিক তথ্য এক ভয়াবহ সত্যকে সামনে এনেছে—২০২৫ সালে তামিলনাড়ুতে ১,০০,০৯৭ জন মানুষ নতুন করে ক্যান্সারের কবলে পড়েছেন। এই প্রথমবার দক্ষিণ ভারতের এই রাজ্যে বার্ষিক আক্রান্তের সংখ্যা এক লক্ষের গণ্ডি ছাড়াল। কিন্তু এই সংখ্যা কি কেবলই তথ্য? নাকি এর গভীরে লুকিয়ে আছে হাজার হাজার মায়ের শূন্য কোল আর অকাল বৈধব্যের গল্প?
যখন ঘরে ফেরে মারণব্যাধি
২০২০ সালে যেখানে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৬৮,৭৫০, মাত্র পাঁচ বছরের ব্যবধানে সেই গ্রাফ আজ আকাশচুম্বী। বিশেষজ্ঞরা একে কেবল 'উন্নতি' বা 'সনাক্তকরণ' বলে উড়িয়ে দিতে পারছেন না। এর পেছনে রয়েছে আধুনিক নগরজীবনের বিষাক্ত অভিশাপ।
চেন্নাইয়ের বিষবাষ্প: চেন্নাইয়ের অলিগলিতে আজ ৮,৫০০-এর বেশি পরিবার ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াই করছে। দূষণ, যান্ত্রিক জীবন আর তীব্র মানসিক চাপ আজ তিল তিল করে শেষ করে দিচ্ছে কর্মক্ষম মানুষদের।
নারীদের নীরব যন্ত্রণা: পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, পুরুষদের তুলনায় নারীরা (৫৩,৫৪২ জন) বেশি আক্রান্ত। স্তন ও জরায়ুমুখের ক্যান্সার কেড়ে নিচ্ছে মায়েদের হাসি। গত এক বছরে কেবল জরায়ু ও স্তন ক্যান্সারে প্রাণ হারিয়েছেন ১০,৮২১ জন নারী। এঁদের অনেকেরই রোগ ধরা পড়েছে একদম শেষ পর্যায়ে, যখন ফেরার সব পথ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।
বিশ্ব ক্যান্সার দিবস ২০২৬: একটি বিশেষ অনুসন্ধান
আজকের এই বিশেষ দিনে সারা বিশ্বের মতো তামিলনাড়ুতেও 'ক্লোজ দ্য কেয়ার গ্যাপ' স্লোগানটি উঠছে। কিন্তু বাস্তব চিত্রটি বড়ই করুণ। যখন একজন মা চেন্নাইয়ের হাসপাতালে স্তন ক্যান্সারের চিকিৎসার জন্য অপেক্ষা করেন, কিংবা ভেলোরের কোনো যুবক তামাকের নীল বিষে মুখগহ্বরের ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে কথা বলার শক্তি হারান, তখন বিশ্ব ক্যান্সার দিবস কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা হয়ে দাঁড়ায় না, হয়ে ওঠে বেঁচে থাকার শেষ লড়াই।
১ লক্ষ কান্নার আখ্যান: এক নজরে ভয়াবহতা
| বছর | আক্রান্তের সংখ্যা | পরিস্থিতির গভীরতা |
| ২০২০ | ৬৮,৭৫০ | সংকেত ছিল স্পষ্ট। |
| ২০২৪ | ৯৬,৪৮৬ | সতর্কবার্তায় কান দেয়নি কেউ। |
| ২০২৫ | ১,০০,০৯৭ | এক লক্ষের সীমা পার—বিপর্যয় এখন দরজায়। |
অকাল মৃত্যুর হাহাকার
২০২৫ সালে তামিলনাড়ুর ১০,৮২১ জন নারী কেবল স্তন, জরায়ুমুখ এবং ডিম্বাশয়ের ক্যান্সারে প্রাণ হারিয়েছেন। এই মৃত্যুগুলো কি এড়ানো যেত না? চিকিৎসকদের মতে, প্রায় অর্ধেক রোগী যখন হাসপাতালের দরজায় পৌঁছান, তখন রোগটি তৃতীয় বা চতুর্থ স্তরে পৌঁছে গেছে। সময়মতো স্ক্রিনিং বা সচেতনতার অভাব আজ হাজার হাজার সংসারকে অনাথ করে দিচ্ছে।
কেন এই ক্যান্সার দিবসে আমাদের লজ্জিত হওয়া উচিত?
পুরুষদের নিরব লড়াই: তামাকের নেশা আজ পুরুষদের (৪৬,৫৫৫ জন আক্রান্ত) মুখগহ্বর আর ফুসফুসকে কুরে কুরে খাচ্ছে।
শহুরে বিষ: চেন্নাই, কাঞ্চিপুরাম আর ভেলোর আজ ক্যান্সারের উপকেন্দ্র। দূষিত বাতাস আর প্রক্রিয়াজাত খাবার আমাদের শরীরের কোষগুলোকে বিদ্রোহী করে তুলছে।
আর্থিক ধ্বংস: ক্যান্সার কেবল শরীর নয়, একটি মধ্যবিত্ত পরিবারকে আর্থিকভাবেও পঙ্গু করে দেয়।
"এখনই সময়—আর দেরি নয়"
আজকের এই দিনে দাঁড়িয়ে বিশেষজ্ঞ মহলের প্রশ্ন একটাই: আমরা কি কেবল আক্রান্তের সংখ্যা গুনব, নাকি প্রতিরোধের পথে হাঁটব? > "একটি ছোট পিণ্ড বা সামান্য ওজন কমে যাওয়াকে অবহেলা করবেন না। আজকের দিনের শপথ হোক—তামাক বর্জন, নিয়মিত ব্যায়াম এবং প্রাথমিক লক্ষণ চিনতে শেখা।" এই এক লক্ষ মানুষ কেবল একটি সংখ্যা হয়ে ইতিহাসের পাতায় হারিয়ে না যাক। তাদের কষ্ট যেন আমাদের আগামীর জন্য শিক্ষা হয়ে থাকে। শোক যখন শক্তিতে পরিণত হয়, তখনই ক্যান্সার জয় সম্ভব।


