জেরুজালেম | বিশেষ সংবাদদাতা মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ত্রিমুখী উত্তেজনার মধ্যেই ইসরায়েলের পার্লামেন্ট 'নেসেট'-এ ঐতিহাসিক ভাষণ দিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। ভাষণে তিনি ইসরায়েলকে ভারতের অন্যতম প্রধান প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা অংশীদার হিসেবে অভিহিত করে দুই দেশের কৌশলগত সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করেন। তবে গাজায় চলমান যুদ্ধ এবং মানবিক সংকট নিয়ে প্রধানমন্ত্রী মোদীর প্রচ্ছন্ন নীরবতা আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনী অংশীদারিত্ব
প্রধানমন্ত্রী মোদী তার ভাষণে ইসরায়েলকে ‘উদ্ভাবন ও প্রযুক্তিগত নেতৃত্বের পাওয়ার হাউস’ হিসেবে বর্ণনা করেন। ভারতের ক্রমবর্ধমান অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে বিশেষ করে সেমিকন্ডাক্টর, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এবং সাইবার নিরাপত্তা খাতে ইসরায়েলি প্রযুক্তির অপরিহার্যতার কথা তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি উল্লেখ করেন:
"ভারত ও ইসরায়েলের মধ্যকার এই অংশীদারিত্ব কেবল দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি আধুনিক বিশ্বের প্রযুক্তিগত মেরুদণ্ড গড়ার একটি প্রাকৃতিক ভিত্তি।"
প্রতিরক্ষা ও কৌশলগত সমন্বয়
প্রতিরক্ষা খাতে ইসরায়েল বর্তমানে ভারতের অন্যতম শীর্ষ সরবরাহকারী। ড্রোন প্রযুক্তি, মিসাইল সিস্টেম এবং যৌথ গবেষণার (R&D) মাধ্যমে দুই দেশের সামরিক সম্পর্ক আরও গভীর করার লক্ষ্য নিয়ে একাধিক সমঝোতা স্মারক (MoU) স্বাক্ষরিত হওয়ার ইঙ্গিত দেন মোদী। বিশেষ করে ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ প্রকল্পের আওতায় প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম তৈরিতে ইসরায়েলি সহায়তার ওপর তিনি বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন।
গাজা ইস্যু ও মানবিক সংকটে নীরবতা
মোদীর এই সফরটি এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে যখন গাজায় গত দুই বছর ধরে ইসরায়েলি সামরিক অভিযানে ব্যাপক প্রাণহানি এবং অবকাঠামোগত ধ্বংসযজ্ঞের অভিযোগ উঠেছে। আন্তর্জাতিক মহলে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে 'গণহত্যার' (Genocide) অভিযোগ এবং যুদ্ধাপরাধের তদন্ত চললেও মোদী তার ভাষণে এ বিষয়ে কোনো সরাসরি মন্তব্য করেননি।
তিনি ৭ অক্টোবর ২০২৩-এর হামাস হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে ইসরায়েলের প্রতি ভারতের অবিচল সংহতি প্রকাশ করেন।
আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার কথা বললেও গাজায় বেসামরিক নাগরিকদের মৃত্যু বা মানবিক বিপর্যয় রোধে ইসরায়েলের দায়বদ্ধতা নিয়ে তিনি কোনো শব্দ খরচ করেননি।
বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের এই অবস্থান ফিলিস্তিন ইস্যুতে নয়াদিল্লির চিরাচরিত ‘ভারসাম্যপূর্ণ নীতি’ থেকে সরে আসার একটি প্রচ্ছন্ন সংকেত হতে পারে।
ভূ-রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ ও ভারতের অবস্থান
ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে চলমান ছায়াযুদ্ধ এবং লোহিত সাগরে উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে মোদীর এই সফর অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। একদিকে জ্বালানি ও চাবাহার বন্দরের জন্য ভারতের কাছে ইরান গুরুত্বপূর্ণ, অন্যদিকে উচ্চপ্রযুক্তির জন্য ইসরায়েল অপরিহার্য। এই জটিল সমীকরণে মোদী কোনো পক্ষ না নিয়ে ইসরায়েলের সাথে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের উন্নয়নকেই প্রাধান্য দিয়েছেন।
প্রতিবেদনের সারসংক্ষেপ:
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেসেট ভাষণ মূলত ‘সন্ত্রাসবাদ ও প্রযুক্তি’—এই দুই স্তম্ভের ওপর ভিত্তি করে সাজানো হয়েছে। একদিকে তিনি ইসরায়েলকে ভারতের আধুনিকায়নের প্রধান কারিগর হিসেবে চিত্রিত করেছেন, অন্যদিকে গাজা সংকট এড়িয়ে গিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছেন যে ভারতের বর্তমান কূটনীতি নৈতিক অবস্থানের চেয়ে কৌশলগত স্বার্থকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।



