কলকাতা | ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬: অবশেষে নিভল বাংলার রাজনীতির অন্যতম ক্ষুরধার মস্তিষ্ক। দীর্ঘ রোগভোগের পর সোমবার রাত ১টা ৩০ মিনিট নাগাদ কলকাতার এক বেসরকারি হাসপাতালে প্রয়াত হলেন মুকুল রায়। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭১ বছর। হাসপাতাল সূত্রে খবর, তিনি দীর্ঘকাল ধরে স্নায়ুজনিত সমস্যা (ডিমেনশিয়া) এবং বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় ভুগছিলেন। তাঁর প্রয়াণে শোকপ্রকাশ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অন্যান্য রাজনৈতিক নেতৃত্ব।
এক নজরে মুকুল রায়ের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার ও তথ্য
মুকুল রায়ের রাজনৈতিক জীবন ছিল উত্থান-পতন এবং সমীকরণ বদলের এক জটিল রসায়ন।
তৃণমূলের জন্ম ও সংগঠন: ১৯৯৮ সালে জাতীয় কংগ্রেস ভেঙে তৃণমূল কংগ্রেস গঠনের অন্যতম কারিগর ছিলেন তিনি। দলের প্রথম সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক হিসেবে বুথ স্তরে সংগঠন গড়ে তোলায় তাঁর অবদান অনস্বীকার্য।
সংসদীয় রাজনীতি: ২০০৬ সালে তিনি প্রথমবার রাজ্যসভার সাংসদ হন। ২০১১ সালে রাজ্যে পরিবর্তনের নেপথ্যে তাঁর সাংগঠনিক রণকৌশলই তৃণমূলকে ক্ষমতায় এনেছিল বলে মনে করা হয়।
রেলমন্ত্রী ও দিল্লি জয়: ২০১২ সালে দীনেশ ত্রিবেদীর ইস্তফার পর তিনি ভারতের রেলমন্ত্রী হন। ইউপিএ-২ সরকারের সময় দিল্লির দরবারে তৃণমূলের প্রধান মুখ ছিলেন মুকুল রায়।
বিজেপি যাত্রা ও সাফল্য: ২০১৭ সালে তৃণমূলের সঙ্গে দীর্ঘ সম্পর্ক ছিন্ন করে তিনি বিজেপিতে যোগ দেন। ২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচনে বাংলায় বিজেপির ১৮টি আসন জয়ের নেপথ্যে তাঁর সাংগঠনিক দক্ষতাকে বড় কৃতিত্ব দেওয়া হয়।
পরিসংখ্যান: ২০২১ নির্বাচন ও ভোটের লড়াই
২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে মুকুল রায় বিজেপির টিকিটে কৃষ্ণনগর উত্তর কেন্দ্র থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।
প্রাপ্ত ভোট: ১,০৯,৩৫৭ (মোট ভোটের প্রায় ৫৪.৭%)।
জয়ের ব্যবধান: তৃণমূল প্রার্থী কৌশানী মুখোপাধ্যায়কে ৩৫,০৮৯ ভোটে পরাজিত করেন।
বিতর্ক ও দুর্নীতির ছায়া
মুকুল রায়ের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে সাফল্যের সমান্তরালে চলেছে একাধিক বিতর্ক:
সারদা ও নারদ কাণ্ড: ২০১৪-১৫ সালে সারদা চিটফান্ড কেলেঙ্কারিতে তাঁর নাম জড়ানোর পর সিবিআই জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হতে হয় তাঁকে। নারদ স্টিং অপারেশনের ফুটেজেও তাঁকে দেখা গিয়েছিল, যা নিয়ে তীব্র রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়।
দলবদল ও বিধায়ক পদ নিয়ে আইনি যুদ্ধ: ২০২১ সালে বিজেপির টিকিটে জেতার মাত্র এক মাস পরেই তিনি পুনরায় মমতার উপস্থিতিতে তৃণমূলে ফিরে আসেন। এর ফলে 'দলত্যাগ বিরোধী আইন' নিয়ে নজিরবিহীন আইনি লড়াই শুরু হয়।
পদ খারিজের নির্দেশ: সাম্প্রতিক অতীতে, ২০২৫ সালের ১৩ নভেম্বর কলকাতা হাইকোর্ট দলত্যাগ বিরোধী আইনের ভিত্তিতে তাঁর বিধায়ক পদ খারিজ করার নির্দেশ দেয়। তবে পরবর্তীকালে সুপ্রিম কোর্ট মানবিক কারণে সেই নির্দেশের ওপর অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশ জারি করেছিল।
ব্যক্তিগত জীবন ও শেষ দিনগুলি
কাঁচরাপাড়ার এক সাধারণ পরিবার থেকে উঠে এসে দিল্লির ক্ষমতা অলিন্দে বিচরণ করা মুকুল রায়ের শেষ কয়েক বছর কেটেছে অত্যন্ত নিঃশব্দে। শারীরিক অসুস্থতা ও মানসিক বিভ্রান্তির (Memory loss) কারণে তিনি সক্রিয় রাজনীতি থেকে দূরে সরে গিয়েছিলেন। তাঁর ছেলে শুভ্রাংশু রায়ও বাবার শারীরিক অবস্থা নিয়ে বারবার উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন।
বাংলার রাজনীতিতে মুকুল রায় এমন এক ব্যক্তিত্ব ছিলেন, যাঁর প্রভাব প্রশাসনিক কক্ষের চেয়ে দলের অন্দরমহলের কৌশলে বেশি অনুভূত হত। তাঁর প্রয়াণে একটি যুগের অবসান ঘটল, যেখানে রাজনীতি কেবল জনসভা নয়, বরং সংখ্যাতত্ত্ব এবং সাংগঠনিক রসায়নের খেলা ছিল।


