মিউনিখ, জার্মানি | বিশেষ প্রতিবেদন
১৯৪৩ সালের ২২শে ফেব্রুয়ারি। সকালের মিউনিখ তখন এক থমথমে আতঙ্কে মোড়া। ঠিক ১৭০ ঘণ্টা আগে যাদের মিউনিখ বিশ্ববিদ্যালয়ের করিডোর থেকে আটক করা হয়েছিল, মাত্র কয়েক ঘণ্টার এক প্রহসনের বিচার শেষে তাদের নিয়ে যাওয়া হচ্ছে মিউনিখের স্ট্যাডেলহেইম কারাগারের বধ্যভূমিতে।
আসামি তিন তরুণ— হান্স শোল (২৪), তার বোন সোফি শোল (২১) এবং তাদের বন্ধু ক্রিস্টোফ প্রবস্ট (২৩)। তাদের অপরাধ? তারা অ্যাডলফ হিটলারের নাৎসি শাসনের বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস দেখিয়েছিলেন। তারা চেয়েছিলেন জার্মান তরুণ সমাজ যেন অন্ধ আনুগত্য ত্যাগ করে সত্যের পথে ফেরে।
প্রতিরোধের জন্ম: ‘হোয়াইট রোজ’ বা শ্বেত গোলাপ
১৯৪২ সালের মাঝামাঝি সময়ে মিউনিখ বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল শিক্ষার্থী এবং তাদের একজন অধ্যাপক মিলে গঠন করেন 'হোয়াইট রোজ' (White Rose)। তারা কোনো অস্ত্র হাতে নেননি, বরং তাদের অস্ত্র ছিল শব্দ। ১৯৪২ থেকে ১৯৪৩ সালের মধ্যে তারা ছয়টি ভিন্ন ভিন্ন লিফলেট বা ইশতেহার তৈরি করেন।
এই লিফলেটগুলোতে তারা নাৎসিদের ইহুদি নিধনযজ্ঞ (Holocaust) এবং যুদ্ধের অসারতা নিয়ে জার্মান জনগণকে সতর্ক করেছিলেন। তারা লিখেছিলেন, "আমরা চুপ থাকব না। আমরাই তোমাদের বিবেক। হোয়াইট রোজ তোমাদের শান্তিতে ঘুমাতে দেবে না।"
সেই অভিশপ্ত ১৮ই ফেব্রুয়ারি
ফেব্রুয়ারির ১৮ তারিখ সোফি এবং হান্স তাদের ষষ্ঠ লিফলেটের সুটকেস নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ভবনে যান। ক্লাস চলাকালীন ফাঁকা করিডোরে তারা লিফলেটগুলো ছড়িয়ে দিচ্ছিলেন। শেষ মুহূর্তে সোফি যখন ওপরের তলা থেকে একমুঠো লিফলেট নিচে ছুড়ে দেন, তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের এক নাৎসি অনুগত প্রহরী (Janitor) তাদের দেখে ফেলেন। সাথে সাথে গেস্টাপো (নাৎসি গোপন পুলিশ) তাদের গ্রেপ্তার করে।
টানা চার দিন অমানুষিক জিজ্ঞাসাবাদের পরও তারা তাদের অন্য সহযোদ্ধাদের নাম প্রকাশ করেননি। সোফি শোল গেস্টাপো অফিসারের চোখের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, "আমি যা করেছি তার জন্য আমি গর্বিত এবং আজও আমি একই কাজ করতাম।"
প্রহসনের বিচার ও চূড়ান্ত বলিদান
২২শে ফেব্রুয়ারি সকালে কুখ্যাত 'পিপলস কোর্ট'-এর বিচারক রোল্যান্ড ফ্রাইসলার বার্লিন থেকে উড়ে আসেন। বিচারে তাদের 'দেশদ্রোহী' ঘোষণা করা হয়। রায় ঘোষণার মাত্র কয়েক ঘণ্টা পরেই কার্যকর করা হয় মৃত্যুদণ্ড।
গিলোটিনের নিচে মাথা রাখার ঠিক আগ মুহূর্তে হান্স শোল চিৎকার করে ওঠেন, যা আজও ইতিহাসের পাতায় প্রতিধ্বনিত হয়:
"Es lebe die Freiheit!" (বেঁচে থাকুক স্বাধীনতা!)
হিটলার ভেবেছিলেন এই তিন তরুণকে হত্যা করলেই প্রতিরোধ থেমে যাবে। কিন্তু তাদের মৃত্যুর পর ওই ষষ্ঠ লিফলেটটি ব্রিটিশ বিমান বাহিনীর মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ কপি করে পুরো জার্মানির ওপর আকাশ থেকে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। তারা পরিণত হয়েছিলেন নাৎসি বিরোধী লড়াইয়ের অমর প্রতীকে।
হাজারো নাম না জানা বীর
ইতিহাসের পাতায় শোল ভাই-বোনের নাম উজ্জ্বল থাকলেও, তারা ছিলেন সেই হাজার হাজার জার্মান নাগরিকের প্রতিনিধি যারা ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়েছেন। কমিউনিস্ট যুব গোষ্ঠী থেকে শুরু করে সাধারণ শ্রমিক— অনেকেই নাৎসিদের 'কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প' বা গিলোটিনে প্রাণ দিয়েছেন। কিন্তু তাদের সেই ত্যাগই শেষ পর্যন্ত আধুনিক গণতান্ত্রিক জার্মানির ভিত্তি গড়ে দিয়েছে।


