বিশেষ বিশ্লেষণ | ঢাকা ২০২৬ সালের সাধারণ নির্বাচনে বিএনপির বিপুল বিজয়ের মাঝেও আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (NCP)। ছাত্র আন্দোলনের প্রেক্ষাপট থেকে আসা এই তরুণ নেতাদের ৫টি আসনে জয়লাভকে অনেকে 'নতুন রাজনীতির সূচনা' বললেও, রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশ একে দেখছেন দীর্ঘমেয়াদী সংসদীয় অস্থিতিশীলতার সূত্রপাত হিসেবে। এনসিপি-র রাজনৈতিক অবস্থান এবং তাদের 'জুলাই চার্টার' নিয়ে পেশাদার দৃষ্টিকোণ থেকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগের কারণ রয়েছে:
১. রাজনৈতিক লেজিটিমেসি ও জোটগত নির্ভরশীলতা
এনসিপি নিজেদের একটি স্বতন্ত্র রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে দাবি করলেও, ভোটের সমীকরণে তারা জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোটের ওপর সরাসরি নির্ভরশীল ছিল। ৩০০ আসনের মধ্যে মাত্র ৫টি আসনে জয় এবং ২৩ জন প্রার্থীর মধ্যে ১৮ জনের পরাজয় প্রমাণ করে যে, 'জেনারেশন-জেড' (Gen Z) বা ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের প্রতি দেশব্যাপী কোনো একক গণজোয়ার তৈরি হয়নি। বরং জোটের ভোট ব্যাংক ব্যবহার করে তাদের এই জয় রাজনৈতিক সুবিধাবাদের নামান্তর বলে সমালোচিত হচ্ছে।
২. 'জুলাই চার্টার' ও সংসদীয় সার্বভৌমত্বের সংকট
এনসিপি-র প্রধান নির্বাচনী অঙ্গীকার 'জুলাই চার্টার'-এর অনেকগুলো ধারা বাংলাদেশের প্রচলিত সংসদীয় গণতন্ত্রের কাঠামোর সাথে সাংঘর্ষিক। বিশেষ করে:
স্বয়ংক্রিয় বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া: কোনো সংস্কার প্রস্তাব সংসদ পাশ না করলে তা সরাসরি কার্যকর করার দাবিটি নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের অবমাননা এবং সংসদের সার্বভৌমত্বকে খর্ব করে।
অনির্বাচিত প্রভাব: ৫ জন এমপি নিয়ে তারা যদি ২০০-র বেশি আসন পাওয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের ওপর নিজেদের এজেন্ডা চাপিয়ে দিতে চায়, তবে তা গণতান্ত্রিক ম্যান্ডেটের পরিপন্থী হবে।
৩. শাসনতান্ত্রিক অভিজ্ঞতার অভাব ও প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা
বিগত ১৮ মাসের অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে এনসিপি-র শীর্ষ নেতাদের অনেকেরই সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে প্রভাব ছিল। সমালোচকদের মতে, এই সময়ে তারা রাষ্ট্রীয় সংস্কারের চেয়ে প্রশাসনিক রদবদল এবং নিজেদের বলয় তৈরিতে বেশি মনোযোগী ছিলেন। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় দৃশ্যমান কোনো সাফল্য দেখাতে না পেরে এখন সংসদের ভেতর 'বিপ্লবী' অবস্থান নেওয়াকে অনেকেই তাদের ব্যর্থতা আড়াল করার কৌশল হিসেবে দেখছেন।
৪. পপুলিজম বনাম প্রাতিষ্ঠানিক রাজনীতি
এনসিপি-র রাজনীতি মূলত 'পপুলিজম' বা জনমোহিনী বক্তৃতার ওপর দাঁড়িয়ে। নাহিদ ইসলাম বা হাসনাত আবদুল্লাহর মতো নেতাদের বক্তৃতা শৈলী অনেক সময় প্রাতিষ্ঠানিক রাজনীতির শিষ্টাচার লঙ্ঘন করে বলে অভিযোগ আছে। সংসদীয় বিতর্কে গঠনমূলক আলোচনার চেয়ে 'রাস্তার রাজনীতি' বা আন্দোলনের হুমকি সংসদকে একটি অকার্যকর ও সংঘাতপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত করতে পারে।
৫. প্রতিনিধি নির্বাচনের ব্যর্থতা: সারজিস আলমের পরাজয়
এনসিপি-র অন্যতম প্রধান মুখ সারজিস আলমের পঞ্চগড়-১ আসনে পরাজয় দলটির জন্য একটি বড় ধাক্কা। এটি ইঙ্গিত দেয় যে, সোশ্যাল মিডিয়া জনপ্রিয়তা এবং বাস্তব মাঠের ভোটের মধ্যে বিশাল ব্যবধান রয়েছে। জনগণের একটি বড় অংশ এখনো প্রথাগত রাজনৈতিক দলের স্থিতিশীলতাকেই বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে।
এনসিপি-র সংসদীয় অবস্থানের সংক্ষিপ্ত মূল্যায়ন
| চ্যালেঞ্জের ক্ষেত্র | এনসিপি-র অবস্থান | পেশাদার উদ্বেগ |
| ম্যান্ডেট | ৫ জন এমপি | সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের বিপরীতে কার্যকর ভূমিকা রাখার সক্ষমতা সীমিত। |
| আদর্শ | জুলাই চার্টার | সংসদীয় প্রথা বনাম বিপ্লবী সংস্কারের মধ্যে সাংবিধানিক দ্বন্দ্ব। |
| জোট | জামায়াত-নির্ভরতা | স্বতন্ত্র রাজনৈতিক সত্তা হিসেবে টিকে থাকা কঠিন হতে পারে। |
| পন্থা | রাজপথের কৌশল | সংসদের ভেতর ও বাইরে দ্বিমুখী অবস্থানের ফলে অস্থিরতা সৃষ্টি। |
বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় এনসিপি একটি 'প্রেসার গ্রুপ' হিসেবে কাজ করতে পারে, কিন্তু ৫ জন এমপির ক্ষুদ্র শক্তি নিয়ে রাষ্ট্রীয় আমূল পরিবর্তনের দাবি অবাস্তব। বিএনপি যদি এই ৫ এমপির 'বিপ্লবী এজেন্ডা'র চাপে নতি স্বীকার না করে, তবে সংসদে এনসিপি ও সরকারি দলের মধ্যে এক তীব্র সংঘাতের পরিবেশ তৈরি হতে পারে, যা গণতান্ত্রিক উত্তরণকে বাধাগ্রস্ত করবে।


