নয়াদিল্লি | ফেব্রুয়ারি ২০২৬
ভারতের সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে ‘স্বচ্ছতা’ ও ‘গোপনীয়তা’র সংঘাত এক নতুন মাত্রা পেয়েছে। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর দফতর (PMO) লোকসভা সচিবালয়কে এক নজিরবিহীন নির্দেশিকায় জানিয়েছে যে, PM CARES, PMNRF এবং NDF সংক্রান্ত কোনো প্রশ্ন বা আলোচনা সংসদে গ্রহণযোগ্য হবে না। সরকারের এই অবস্থান একদিকে যেমন আইনি তর্কের জন্ম দিয়েছে, অন্যদিকে নির্বাহী বিভাগের জবাবদিহি নিয়ে তৈরি করেছে গভীর রাজনৈতিক ধোঁয়াশা।
বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু: সংসদীয় বিধি বনাম নৈতিক দায়বদ্ধতা
প্রধানমন্ত্রীর দফতর তাদের আপত্তিতে লোকসভার কার্যপরিচালনা বিধির Rule 41(2)-এর দোহাই দিয়েছে। সরকারের দাবি, এই তহবিলগুলো কোনো সরকারি বাজেট বা ‘কনসোলিডেটেড ফান্ড অফ ইন্ডিয়া’ থেকে অর্থ পায় না। যেহেতু এগুলো ব্যক্তিগত অনুদানে চলে, তাই এগুলো নিয়ে সংসদে উত্তর দেওয়ার কোনো বাধ্যবাধকতা সরকারের নেই।
তবে বিশ্লেষকরা এখানে তিনটি গুরুতর ‘কোয়েশ্চেন মার্ক’ বা প্রশ্নচিহ্ন দেখছেন:
সরকারি পরিচয় বনাম আইনি তকমা: ট্রাস্টের চেয়ারম্যান স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী, পদাধিকার বলে ট্রাস্টি হলেন স্বরাষ্ট্র, রক্ষা ও অর্থমন্ত্রী। সরকারি প্রতীক ও ডোমেইন ব্যবহারের পরেও কেন একে ‘বেসরকারি ট্রাস্ট’ বলে দাবি করা হচ্ছে?
রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার (PSU) অবদান: তথ্য অনুযায়ী, শতাধিক রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা তাদের CSR ফান্ড থেকে কয়েক হাজার কোটি টাকা এখানে জমা দিয়েছে। যদি জনগণের করের টাকায় চলা সংস্থাগুলি এখানে বিনিয়োগ করে, তবে সেই অর্থের গতিবিধি কেন সংসদীয় কমিটির অডিট (CAG) থেকে দূরে থাকবে?
RTI এবং তথ্যের অধিকার: তথ্য জানার অধিকার আইনের (RTI) আওতা থেকে এই তহবিলকে বাইরে রাখায় সাধারণ নাগরিকদের জানার কোনো সুযোগ নেই যে, ২০২৪-২৬ সালের সংগৃহীত অর্থ ঠিক কোন খাতে ব্যয় হয়েছে।
আর্থিক অস্পষ্টতা: ২০২৬-এর প্রেক্ষাপট
২০২৩ সালের মার্চ পর্যন্ত এই তহবিলে উদ্বৃত্ত ছিল প্রায় ৬,২৮৪ কোটি টাকা। কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হলো, ২০২৪ এবং ২০২৫ অর্থবছরের কোনো অডিট রিপোর্ট এখনো জনসমক্ষে আনা হয়নি। বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, স্বচ্ছতার এই অভাব কেবল প্রশাসনিক নয়, বরং রাজনৈতিক অভিসন্ধিমূলক। বিশেষ করে যখন অতিমারি-পরবর্তী সময়ে এই ফান্ডের অর্থে কেনা চিকিৎসা সরঞ্জামের গুণমান নিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রশ্ন উঠেছে।
সাংবিধানিক প্রভাব ও রাজনৈতিক লড়াই
সংসদীয় রাজনীতিতে প্রশ্ন করার অধিকার খর্ব করাকে বিরোধীরা ‘গণতান্ত্রিক কণ্ঠরোধ’ হিসেবে আখ্যা দিচ্ছে। কংগ্রেস ও বামপন্থী দলগুলোর দাবি, এটি নির্বাহী বিভাগের একাধিপত্য কায়েমের চেষ্টা। অন্যদিকে, আদালতও এই বিষয়ে একটি দোদুল্যমান অবস্থানে রয়েছে। দিল্লি হাইকোর্টের সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, একটি জনকল্যাণমূলক ট্রাস্ট হওয়ার কারণে এর গোপনীয়তা রক্ষার বিশেষ অধিকার থাকতে পারে—যা আইনি বিতর্কে নতুন রসদ জুগিয়েছে।
বিশেষ মন্তব্য: “একটি গণতান্ত্রিক কাঠামোয় যখন প্রধানমন্ত্রীর পদের গুরুত্ব ব্যবহার করে অর্থ সংগ্রহ করা হয়, তখন সেই অর্থের প্রতিটি পয়সার হিসেব জনগণের প্রতিনিধিদের (এমপি) কাছে থাকা বাঞ্ছনীয়। আইনি কারিগরি ব্যবহার করে সংসদকে এড়িয়ে যাওয়া সাংবিধানিক নৈতিকতার পরিপন্থী।”
PM CARES-কে ঘিরে এই রহস্যময় অবস্থান ভারতের সংসদীয় কাঠামোতে এক বিপজ্জনক নজির তৈরি করতে পারে। যদি শীর্ষস্থানীয় মন্ত্রীদের দ্বারা পরিচালিত কোনো তহবিল সংসদের কাছে দায়বদ্ধ না থাকে, তবে ভবিষ্যতে অন্যান্য সরকারি প্রকল্পের ক্ষেত্রেও অনুরূপ গোপনীয়তার সংস্কৃতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়।


