নিজস্ব প্রতিবেদক, দুর্গাপুর ও বার্নপুর ভারতের শিল্প মানচিত্রে এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের সূচনা হতে চলেছে। কেন্দ্রীয় সরকারের দীর্ঘ প্রতীক্ষিত চারটি শ্রম বিধি (Labour Codes) আগামী ১ এপ্রিল ২০২৬ থেকে দেশজুড়ে পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর করার প্রস্তুতি চূড়ান্ত পর্যায়ে। রাষ্ট্রায়ত্ত ইস্পাত সংস্থা স্টিল অথরিটি অফ ইন্ডিয়া লিমিটেড (SAIL) ইতিমধ্যেই তাদের প্রস্তুতি সম্পন্ন করে সেবি-কে (SEBI) আনুষ্ঠানিক পত্র পাঠিয়েছে। তবে এই পরিবর্তনের মেঘ ঘনাচ্ছে শ্রমিক আন্দোলনের আকাশে। সিআইটিইউ (CITU)-সহ একাধিক বামপন্থী শ্রমিক সংগঠন এই নতুন বিধিকে 'শ্রমিক স্বার্থবিরোধী' আখ্যা দিয়ে আন্দোলনের ডাক দিয়েছে।
১. সেল (SAIL)-এর প্রস্তুতি ও বাস্তবায়নের রূপরেখা
সেবি-কে দেওয়া তথ্যানুযায়ী, ১ এপ্রিল ২০২৬ থেকে দুর্গাপুর স্টিল প্ল্যান্ট (DSP), ইস্কো (IISCO), বোকারো এবং ভিলাইয়ের মতো সমস্ত ইউনিটে একযোগে নতুন শ্রম বিধি কার্যকর হবে। এই পরিবর্তনের ফলে প্রায় ১.৫ লক্ষ স্থায়ী ও অস্থায়ী শ্রমিক সরাসরি প্রভাবিত হবেন।
বেতন কাঠামোয় সংস্কার: নতুন 'কোড অন ওয়েজেস' অনুযায়ী, কর্মীদের মূল বেতন (Basic Pay) হতে হবে তাদের মোট বেতনের (CTC) কমপক্ষে ৫০ শতাংশ। এর ফলে কর্মীদের ভবিষ্যতের সঞ্চয় বা সামাজিক সুরক্ষা (PF এবং Gratuity) উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।
১২ ঘণ্টার কর্মদিবসের বিকল্প: নতুন বিধিতে দৈনিক কাজের সময় ৮ ঘণ্টা থেকে বাড়িয়ে ১২ ঘণ্টা করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। তবে সাপ্তাহিক কাজের সর্বোচ্চ সীমা ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। অর্থাৎ, কোনো ইউনিটে ১২ ঘণ্টার শিফট চালু হলে কর্মীরা সপ্তাহে ৩ দিন সবেতন ছুটির সুবিধা পাবেন।
২. সিআইটিইউ (CITU)-এর তীব্র প্রতিবাদ ও আইনি লড়াইয়ের ডাক
কেন্দ্রের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে শুরু থেকেই খড়্গহস্ত সিআইটিইউ। সংগঠনের কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতৃত্বের দাবি, এই নতুন বিধি আসলে কর্পোরেট স্বার্থ চরিতার্থ করার একটি হাতিয়ার।
সিআইটিইউ-এর প্রধান আপত্তির জায়গাগুলো হলো:
৮ ঘণ্টার লড়াইয়ের অপমান: সিআইটিইউ-এর মতে, দীর্ঘ লড়াইয়ের পর অর্জিত ৮ ঘণ্টার কাজের অধিকারকে ১২ ঘণ্টায় রূপান্তরিত করা এক ধরনের 'নব্য দাসত্ব'। তাদের আশঙ্কা, দীর্ঘ সময় কাজ করার ফলে উৎপাদন ইউনিটে দুর্ঘটনার হার বৃদ্ধি পাবে এবং শ্রমিকের সামাজিক জীবন ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
হাতে পাওয়া বেতন বা টেক-হোম পে হ্রাস: যদিও পিএফ বৃদ্ধিকে ইতিবাচক বলা হচ্ছে, কিন্তু সিআইটিইউ-এর দাবি, বর্তমানে উচ্চ মূল্যবৃদ্ধির বাজারে শ্রমিকের হাতে পাওয়া নগদ টাকা কমে গেলে জীবনযাত্রার মান ব্যাহত হবে।
সুরক্ষার অভাব: নতুন 'ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিলেশনস কোড'-এর অধীনে ৩০০ জন পর্যন্ত কর্মী থাকা কারখানাগুলো সরকারের পূর্বানুমতি ছাড়াই লে-অফ বা ছাঁটাই করতে পারবে। সিআইটিইউ একে শ্রমিকদের কর্মসংস্থানের নিরাপত্তার ওপর সরাসরি আঘাত হিসেবে দেখছে।
৩. দুর্গাপুর ও শিল্পাঞ্চলে প্রভাব
দুর্গাপুরের ইস্পাত ও ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্পাঞ্চলে সিআইটিইউ অনুমোদিত ইউনিয়নগুলো ইতিমধ্যেই গেট মিটিং এবং প্রচার অভিযান শুরু করেছে। হিন্দুস্তান স্টিল এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন (HSEU)-এর স্থানীয় নেতৃত্বের মতে, "ম্যানেজমেন্ট একতরফাভাবে এই নিয়ম চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। আমরা প্রতিটি ইউনিটে শ্রমিকদের সংগঠিত করছি যাতে ১ এপ্রিলের আগে বড়সড় প্রতিরোধ গড়ে তোলা যায়।"
৪. বিশেষজ্ঞদের অভিমত ও ভবিষ্যৎ
অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করছেন, এই নতুন শ্রম বিধি বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করবে এবং ভারতের ইজ অফ ডুইং বিজনেস (Ease of Doing Business) র্যাঙ্কিং উন্নত করবে। তবে শ্রমিকদের ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনের ভারসাম্য (Work-Life Balance) এবং ইউনিয়নের দর কষাকষির ক্ষমতা কতটা অক্ষুণ্ণ থাকবে, তা নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েই গেছে।
১ এপ্রিল ২০২৬ ভারতের শ্রম ইতিহাসে এক সন্ধিক্ষণ হতে চলেছে। একদিকে আধুনিকীকরণ ও নমনীয় কাজের পরিবেশের দাবি, অন্যদিকে কয়েক দশকের অর্জিত অধিকার রক্ষার আন্দোলন—এই দুইয়ের দ্বন্দ্বে দুর্গাপুরসহ ভারতের শিল্পাঞ্চলগুলো আগামী মাসগুলোতে উত্তপ্ত থাকতে পারে বলেই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।

.png)
.png)
.png)
.png)
.png)
.png)
.png)
.png)
