বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন, কলকাতা: রাজ্য সরকার ঢাকঢোল পিটিয়ে ‘শ্রমশ্রী’ ও ‘পরিযায়ী শ্রমিক কল্যাণ তহবিল’ ঘোষণা করলেও, বামপন্থীদের অনুসন্ধানে উঠে আসছে এক ভয়াবহ পরিসংখ্যান। সিপিআই(এম)-এর দাবি, এই তহবিল আসলে ২০২৬-এর নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার জন্য একটি ‘অর্গানাইজড লুঠ’। সরকার যেখানে ২২.৪ লক্ষ শ্রমিকের কথা বলছে, সেখানে বাস্তবের মাটিতে দাঁড়িয়ে সরকারি তথ্যেরই অসংগতি ফাঁস করছে বাম শিবির।
১. অংকের গোলমাল: ২২ লক্ষ না কি ২৯ লক্ষ?
রাজ্য সরকারের নিজস্ব পোর্টাল ‘কর্মসাথী (পরিযায়ী শ্রমিক)’-র তথ্য অনুযায়ী, নথিবদ্ধ শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় ২৯ লক্ষ। অথচ ‘শ্রমশ্রী’ প্রকল্পের লক্ষ্যমাত্রা রাখা হয়েছে মাত্র ২২.৪ লক্ষ।
বামপন্থীদের প্রশ্ন: বাকি ৬.৬ লক্ষ শ্রমিক কি তবে ব্রাত্য? নাকি এই বিশাল সংখ্যার হেরফের করা হচ্ছে নিজেদের ক্যাডারদের তালিকায় ঢোকানোর জন্য?
সিপিআই(এম) নেতা সুজন চক্রবর্তীর তোপ: “নথিবদ্ধ শ্রমিকের এক-তৃতীয়াংশও যদি মাসে ৫,০০০ টাকা করে পায়, তবে বছরে খরচ হওয়ার কথা প্রায় ১৩,৪৪০ কোটি টাকা। কিন্তু বাজেটে এই খাতের বরাদ্দ ও প্রকৃত খরচের কোনো সামঞ্জস্য নেই। এই টাকা যাবে কার পকেটে?”
২. ডিস্ট্রিবিউশন গ্যাপ: ১০০-র মধ্যে ১ জনও নয়!
২০২৫-এর অক্টোবর মাসের সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ৭৫,০০০ জনের বেশি আবেদনকারীর মধ্যে মাত্র ১,০০০ জন মাসিক ভাতা পেয়েছেন।
অনুসন্ধানী তথ্য: অর্থাৎ, মোট আবেদনকারীর মাত্র ১.৩৩% সুবিধা পেয়েছেন। বাকি ৯৮ শতাংশেরও বেশি শ্রমিক ‘ভেরিফিকেশন’-এর জালে আটকে।
অভিযোগ: বামেদের মতে, এই ‘ভেরিফিকেশন’ আসলে রাজনৈতিক স্ক্রিনিং। যারা তৃণমূলের মিছিলে যাবে না, তাদের নাম ‘পুলিশ ভেরিফিকেশন’-এ বাতিল করা হচ্ছে।
৩. ‘কাটমানি’র নতুন রেট চার্ট: গ্রাউন্ড রিপোর্ট
সিপিআই(এম)-এর বিভিন্ন শাখা সংগঠন (CITU) জেলায় জেলায় তথ্য সংগ্রহ করে দেখেছে যে, ফর্ম প্রতি ২০০ থেকে ৫০০ টাকা অগ্রিম নেওয়া হচ্ছে।
অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্য: মালদা ও মুর্শিদাবাদের মতো শ্রমিক-প্রধান জেলাগুলিতে ‘ফর্ম নম্বর ২’ জমা দেওয়ার জন্য পঞ্চায়েত স্তরে অলিখিত ‘সার্ভিস ট্যাক্স’ চালু হয়েছে।
তহবিলের অস্বচ্ছতা: কল্যাণ তহবিলের টাকা সরাসরি শ্রমিকের অ্যাকাউন্টে গেলেও, সেই টাকা তোলার পর ‘লোকাল পার্টি ফান্ড’-এ ১,০০০ টাকা জমা দেওয়ার ফতোয়া জারি হয়েছে অনেক ব্লকে।
🔍 এক নজরে বামেদের তোলা তথ্য-প্রমাণ (Data Snapshot)
| বিষয় | সরকারি বয়ান (২০২৫-২৬) | বামেদের অনুসন্ধানী তথ্য |
| নথিবদ্ধ শ্রমিক | ২৯ লক্ষ (প্রায়) | ৬ লক্ষের বেশি শ্রমিকের হদিস নেই |
| ভাতা প্রাপক | ১,০০০ জন (অক্টোবর পর্যন্ত) | ৯৮.৬% আবেদনকারী বঞ্চিত |
| বরাদ্দ বনাম ব্যয় | সম্পূর্ণ স্বচ্ছ | অডিট ছাড়াই টাকা বণ্টন, ক্যাগ (CAG) রিপোর্ট এড়িয়ে চলা |
| বাস্তবায়ন | ২০২৪ ডিসেম্বর থেকে কার্যকর | অধিকাংশ ব্লকে এখনো পেমেন্ট শুরুই হয়নি |
৪. শিল্পহীন বাংলা ও ‘ভাতা’র রাজনীতি
বামেদের মূল আক্রমণ হলো রাজ্যের বিনিয়োগ শূন্যতা নিয়ে। আলিমুদ্দিন স্ট্রিটের বক্তব্য, “তৃণমূল সরকার চাইছে বাংলার যুবকরা বাইরে গিয়ে গতর খাটুক, আর ভোটের সময় ৫,০০০ টাকার ভিক্ষে দিয়ে তাদের মুখ বন্ধ করা হোক।”
“পরিযায়ী হওয়াটা কোনো গর্বের বিষয় নয়, এটা রাজ্যের ব্যর্থতা। সেই ব্যর্থতাকে ঢাকতে এখন দুর্নীতির তহবিল গড়ে তোলা হচ্ছে।” — সিপিআই(এম) রাজ্য কমিটির সদস্য।
ভোটের অংক: আপনি কী দেখছেন?
৫,০০০ টাকার এই মাসিক ভাতা কি সত্যিই শ্রমিকের ঘরে চাল জোগাবে, নাকি এটি আসলে পঞ্চায়েত ও ব্লক স্তরের নেতাদের পকেট ভরার নতুন রাস্তা? তথ্যের এই গরমিল কি বড় কোনো কেলেঙ্কারির ইঙ্গিত?
আপনার এলাকায় কি সরকারি তালিকার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে? আপনি কি যোগ্য হওয়া সত্ত্বেও ভাতা পাননি? আমাদের জানান।


