পশ্চিমবঙ্গের বিচারব্যবস্থা বর্তমানে এক অভূতপূর্ব সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে আদালতের বারান্দায় জমে থাকা প্রায় ৩৯ লক্ষ মামলার পাহাড়, আর অন্যদিকে রাজ্যের প্রায় ৮০ লক্ষ মানুষের ভোটাধিকারের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দায়। সুপ্রিম কোর্টের এক ঐতিহাসিক নির্দেশে কয়েকশ বিচারককে এজলাস থেকে তুলে নিয়ে ভোটার তালিকা সংশোধনের (SIR) গুরুভার দেওয়ায় রাজ্যের বিচারবিভাগীয় কাঠামোয় এক বিশাল শূন্যতা তৈরি হয়েছে।
🔴 ১. কেন এজলাস ছেড়ে ফিল্ডে নামলেন বিচারকরা?
সাধারণত ভোটার তালিকা সংশোধন করেন বিডিও (BDO), এসডিও (SDO) বা জেলাশাসকের মতো প্রশাসনিক আধিকারিকরা। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সাথে ভারতের নির্বাচন কমিশনের (ECI) প্রবল ‘আস্থার সংকট’ (Trust Deficit) তৈরি হওয়ায় সুপ্রিম কোর্ট মনে করেছে, কোনো রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক চাপের ঊর্ধ্বে উঠে একমাত্র নিরপেক্ষ বিচারবিভাগীয় মস্তিষ্কই এই জট খুলতে পারে।
প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের বেঞ্চের নির্দেশে কলকাতা হাইকোর্টের অধীনে থাকা জেলা জজ, অতিরিক্ত জেলা জজ এবং অন্তত ৩ বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন সিভিল জজদের এই কাজে নামানো হয়েছে। যার ফলে বিচারকক্ষে বিচারপ্রার্থীদের মামলার বদলে এখন বিচারকদের টেবিলে স্তূপীকৃত হচ্ছে ভোটারদের নথিপত্র।
📉 ২. বিচারপ্রক্রিয়ায় ‘মহাসংকট’: পরিসংখ্যানের আয়নায় বর্তমান পরিস্থিতি
পশ্চিমবঙ্গের নিম্ন আদালতগুলো আগে থেকেই মামলার ভারে জর্জরিত। এই নতুন পরিস্থিতির ফলে যা ঘটছে:
মামলার পাহাড়: রাজ্যে বর্তমানে প্রায় ৩৮,৭৯,১৭৬টি মামলা অমীমাংসিত। এর মধ্যে প্রায় ৩২ লক্ষ ফৌজদারি মামলা, যেখানে মানুষের জীবন ও স্বাধীনতার প্রশ্ন জড়িয়ে।
শয়ে শয়ে বিচারক এখন 'ভোটার অফিসার': প্রায় ২৯৪টি বিধানসভা কেন্দ্রের জন্য গড়ে একজন করে বিচারবিভাগীয় অফিসারকে নিয়োগ করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, রাজ্যের বিচারবিভাগীয় শক্তির এক বিশাল অংশ এখন আদালতের কাজ থেকে বিচ্ছিন্ন।
শুনানি বিপর্যয়: দক্ষিণ ২৪ পরগনা, উত্তর ২৪ পরগনা এবং মুর্শিদাবাদের মতো জনবহুল জেলাগুলোতে, যেখানে মামলার সংখ্যা সবচেয়ে বেশি, সেখানে আদালতের দৈনন্দিন কার্যতালিকা (Cause List) কার্যত লণ্ডভণ্ড। বহু গুরুত্বপূর্ণ মামলার শুনানি মাসের পর মাস পিছিয়ে যাচ্ছে।
🚫 ৩. ছুটি বাতিল ও বিচারকদের ওপর মানসিক চাপ
কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি সুজয় পাল এক কঠোর নির্দেশে জানিয়েছেন:
আগামী ৯ মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত রাজ্যের কোনো বিচারবিভাগীয় অফিসার কোনো ছুটি নিতে পারবেন না।
এমনকি জুডিশিয়াল একাডেমিতে বিচারকদের যে বার্ষিক প্রশিক্ষণ চলে, তাও স্থগিত রাখা হয়েছে।
বিচারকরা এখন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ভোটারদের দাবি ও আপত্তি (Claims and Objections) খতিয়ে দেখছেন, যা তাঁদের নিয়মিত বিচারিক কাজের ধরনে আমূল পরিবর্তন এনেছে।
🏥 ৪. ‘ইমার্জেন্সি ওয়ার্ড’-এর মতো চলছে আদালত
পুরো বিচারব্যবস্থা যাতে ধসে না পড়ে, তার জন্য কিছু জরুরি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে:
স্পেশাল ৯৫ রোস্টার: কলকাতা হাইকোর্ট ৯৫ জন বিচারককে এই কাজের বাইরে রেখেছে। তাঁরা শুধুমাত্র অত্যন্ত সংবেদনশীল মামলা যেমন— POCSO (শিশু নিগ্রহ), NDPS (মাদক পাচার) এবং খুনের মতো গুরুতর অপরাধের শুনানি চালিয়ে যাচ্ছেন।
সাধারণ বিচারপ্রার্থীদের দীর্ঘশ্বাস: সাধারণ জমি-জায়গার বিবাদ বা ছোটখাটো ফৌজদারি অপরাধে যারা বিচারের আশায় ছিলেন, তাঁদের জন্য এখন আদালতের দরজা কার্যত বন্ধ। ‘পরবর্তী তারিখ’ (Next Date) পাওয়াই এখন তাঁদের একমাত্র নিয়তি।
🔥 ৫. এই সংকটের রাজনৈতিক ও সামাজিক মূল্য
সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছে যে, "নিয়মিত মামলার শুনানি ব্যাহত হওয়া সত্ত্বেও" ভোটার তালিকার শুদ্ধতা বজায় রাখা জরুরি।
গণতান্ত্রিক স্বচ্ছতা: যদি ৫০-৮০ লক্ষ ভোটারের তথ্য ভুল থাকে, তবে নির্বাচনের ফলাফল বদলে যেতে পারে। সেই বিপর্যয় রুখতেই বিচারকদের এই ‘বলিদান’।
বিচারব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি: এই কয়েক সপ্তাহের স্থবিরতা বকেয়া মামলার সংখ্যায় এমন এক বোঝা যোগ করবে, যা কাটিয়ে উঠতে হয়তো আগামী কয়েক বছর সময় লেগে যাবে।
💡 ২৮ ফেব্রুয়ারির অপেক্ষা
২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬—এই দিনটিই হলো চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশের ডেডলাইন। ওইদিন পর্যন্ত বিচারকরা ভোটার তালিকা নিয়েই ব্যস্ত থাকবেন। এরপর তাঁরা যখন এজলাসে ফিরবেন, তখন তাঁদের সামনে অপেক্ষমাণ থাকবে আরও কয়েক লক্ষ নতুন বকেয়া মামলার ফাইল।
"গণতন্ত্র বাঁচাতে গিয়ে বিচারব্যবস্থার এই যে সাময়িক লকডাউন, তার খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ বিচারপ্রার্থীদের, যাঁরা বছরের পর বছর ধরে একটি রায়ের অপেক্ষায় দিন গুনছেন।"


