নিজস্ব প্রতিবেদন, দুর্গাপুর:
বিংশ শতাব্দীর দোরগোড়ায় দাঁড়িয়েও উনিশ শতকের যুক্তিবাদী আন্দোলনের প্রাসঙ্গিকতা আজও ফুরিয়ে যায়নি— রবিবার দুর্গাপুরের সিটি সেন্টারে আয়োজিত এক বিশেষ সেমিনারে এই অভিমত ব্যক্ত করলেন বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক ও গবেষক অধ্যাপক শক্তিসাধন মুখোপাধ্যায়। স্থানীয় অ্যাকাডেমিক প্রতিষ্ঠান 'সোশ্যাল সায়েন্স ইনস্টিটিউট অফ রিসার্চ এন্ড স্টাডিজ' (SIRS)-এর উদ্যোগে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে ‘ডিরোজিও ও ডিরোজিয়ানস্’ শীর্ষক স্মারক বক্তৃতায় উঠে এল বাংলার নবজাগরণে ইয়ং বেঙ্গল আন্দোলনের সুদূরপ্রসারী প্রভাবের কথা।
১লা মার্চ, ২০২৬ তারিখে দুর্গাপুরের 'মাঙ্গলিক' প্রেক্ষাগৃহে অনুষ্ঠিত এই সভায় সভাপতিত্ব করেন প্রাক্তন শিক্ষক পূর্ণচন্দ্র মুখোপাধ্যায়। অনুষ্ঠানে প্রধান আলোচক অধ্যাপক শক্তিসাধন মুখোপাধ্যায় তাঁর সুচিন্তিত ভাষণে হিন্দু কলেজের তরুণ অধ্যাপক হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিওর বৈপ্লবিক শিক্ষাদর্শের স্মৃতিচারণ করেন। তিনি বলেন, ডিরোজিও ছাত্রদের শিখিয়েছিলেন যে যুক্তি প্রয়োগ করতে ভয় পাওয়া হলো দাসত্বের লক্ষণ। তাঁর মতে, ইয়ং বেঙ্গল আন্দোলনের মাধ্যমেই বাংলার জীর্ণ সমাজ ব্যবস্থায় প্রথম 'শক থেরাপি' প্রয়োগ করা হয়েছিল, যা সমাজকে আধুনিকতার পথে এগিয়ে নিতে সাহায্য করে।
SIRS: ইতিহাস ও সমাজচর্চায় একনিষ্ঠ প্রতিষ্ঠান
অনুষ্ঠানের একটি বড় অংশ জুড়ে ছিল আয়োজক সংস্থা SIRS-এর দীর্ঘ ১৮ বছরের কর্মকাণ্ডের খতিয়ান। সংস্থার যৌথ সম্পাদক তাঁর উদ্বোধনী বক্তব্যে প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করেন:
প্রতিষ্ঠার পটভূমি: ২০০৮ সালে রূপক দাস, তাপসী দাস, আদিত্য ঘোষ, অতসী চক্রবর্তী এবং স্বপন মজুমদারের মতো গবেষক ও চিন্তাবিদদের উদ্যোগে এই উদ্ভাবনী প্রতিষ্ঠানের যাত্রা শুরু হয়।
গবেষণার পরিধি: SIRS মূলত সমাজবিজ্ঞান ও ইতিহাসের পঠন-পাঠনের একটি নির্ভরযোগ্য মঞ্চ। অতীতের ইতিহাসকে বর্তমানের যুক্তিনির্ভর আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গিতে মানুষের সামনে উপস্থাপন করাই এই সংস্থার প্রধান ব্রত।
বহুমাত্রিক চর্চা: কেবল ইতিহাস নয়, বরং সাহিত্য, বিজ্ঞান, সংগীত, ক্রীড়া এবং চলচ্চিত্রের মতো বিচিত্র ক্ষেত্রে এই সংস্থা তাদের গবেষণার প্রসার ঘটিয়েছে।
তারুণ্যের জয়গান: বর্তমান প্রজন্মের একঝাঁক তরুণ মুখই এই প্রতিষ্ঠানের মূল চালিকাশক্তি, যারা ভবিষ্যৎ সমাজ সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধিতে সচেষ্ট।
আলোচনার নির্যাস ও প্রভাব
অধ্যাপক মুখোপাধ্যায় তাঁর বক্তব্যে গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করেন যে, ডিরোজিয়ানরা জাতপাত, অস্পৃশ্যতা এবং পৌত্তলিকতার বিরুদ্ধে যে কঠোর অবস্থান নিয়েছিলেন, তা পরবর্তীতে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বা ব্রাহ্মসমাজের সমাজ সংস্কার আন্দোলনের পথ প্রশস্ত করেছিল। তিনি আধুনিক যুবসমাজকে সোশ্যাল মিডিয়ার 'অন্ধ অনুকরণ' ত্যাগ করে ডিরোজিওর মতো নিজস্ব চিন্তাশক্তি ব্যবহারের আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানে শহরের বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী, গবেষক এবং ছাত্রছাত্রীদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। SIRS-এর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আগামী দিনেও দুর্গাপুর জুড়ে এমন গঠনমূলক ও অ্যাকাডেমিক আলোচনা চক্রের ধারা বজায় রাখা হবে।












