ওয়ায়ানাদ/কোয়েম্বাটোর: গত ১৬ এবং ১৭ মার্চ দক্ষিণ ভারতের বড় একটি অংশ জুড়ে প্রকৃতির এক তাণ্ডবলীলা প্রত্যক্ষ করল সাধারণ মানুষ। বিশেষ করে কেরালার ওয়ায়ানাদ জেলায় গত ২৫ বছরের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ শিলাবৃষ্টি হয়েছে। রাস্তার ওপর এবং বাড়ির ছাদে বরফের এমন পুরু আস্তরণ জমেছিল যে, তা মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত (প্রায় ১২ ঘণ্টারও বেশি সময়) গলেনি।
তামিলনাড়ু ও কর্ণাটকের চিত্র
তামিলনাড়ুর কোয়েম্বাটোর অঞ্চলের অন্নুর ও মেট্টুপালয়ামে শিলাবৃষ্টিতে ফসলি জমির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। সাধারণত শিলাবৃষ্টির বরফ ৩-৪ ঘণ্টার মধ্যে গলে গেলেও, এবার অন্নুর, ইরোড ও নীলগিরিতে অনেক জায়গায় ১২ থেকে ৩৮ ঘণ্টা পর্যন্ত বরফ জমে থাকতে দেখা গেছে। অন্যদিকে কর্ণাটকের ধারওয়াড় জেলার কালঘাটগি গ্রামের দৃশ্য ছিল অনেকটা কাশ্মীরের মতো; চারদিকে সাদা বরফের চাদর বিছিয়ে গিয়েছিল।
কেন গলছে না এই বরফ?
বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, সাধারণত ট্রপিক্যাল অঞ্চলে শিলা দ্রুত গলে গেলেও এবার তা হয়নি কারণ:
অত্যধিক সঞ্চয় (Insulation Effect): এত বেশি পরিমাণে শিলা দ্রুত পড়েছে যে ওপরের স্তরের বরফ ভেতরের স্তরকে বাইরের তাপ থেকে রক্ষা করেছে (ইনসুলেশন)।
তাপমাত্রা হ্রাস: বৃষ্টির কারণে ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা কমে ০° সেলসিয়াসের কাছাকাছি চলে এসেছিল, যা বরফ গলে যাওয়ার প্রক্রিয়াকে ধীর করে দেয়।
জলবায়ু পরিবর্তন: একটি বিরল 'ওয়েস্টার্ন ডিস্টার্বেন্স' বা পশ্চিমী ঝঞ্ঝার কারণে বায়ুমণ্ডলে তীব্র অস্থিরতা তৈরি হয়, যার ফলে স্বাভাবিকের চেয়ে বড় আকারের শিলা সৃষ্টি হয়েছে।
ষড়যন্ত্র তত্ত্ব বনাম বাস্তবতা: জিও-ইঞ্জিনিয়ারিং কি দায়ী?
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকেই দাবি করছেন যে বিল গেটস-এর অর্থায়নে পরিচালিত SCoPEx (Stratospheric Controlled Perturbation Experiment) প্রকল্পের মাধ্যমে 'কেমট্রেল' বা রাসায়নিক ছিটিয়ে এই আবহাওয়া পরিবর্তন করা হয়েছে।
প্রকৃত তথ্য: এই দাবির কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এই প্রকল্পটি একটি ছোট স্কেলের পরীক্ষা ছিল এবং এটি কোনোভাবেই বড় কোনো শিলাবৃষ্টি বা আবহাওয়া পরিবর্তনের সক্ষমতা রাখে না। ২০১৬ সালে ৭৭ জন বায়ুমণ্ডলীয় বিজ্ঞানীর ওপর করা এক জরিপেও এ ধরনের গোপন প্রোগ্রামের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। আকাশ পরিষ্কার থাকাকালীন বিমানে যে সাদা দাগ দেখা যায়, তা কেবলই ঘনীভূত জলীয় বাষ্প বা 'কনট্রেল'।
একনজরে ক্ষয়ক্ষতির সারণী
| রাজ্য | ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা | স্থায়িত্ব (বরফ) | বিশেষ পরিস্থিতি |
| কেরালা | ওয়ায়ানাদ | ১২+ ঘণ্টা | ২৫ বছরের মধ্যে ভয়াবহতম। |
| তামিলনাড়ু | কোয়েম্বাটোর, নীলগিরি | ১২ থেকে ৩৮ ঘণ্টা | ফসলি জমির ব্যাপক ক্ষতি। |
| কর্ণাটক | কালঘাটগি (ধারওয়াড়) | - | গ্রাম দেখতে হুবহু কাশ্মীরের মতো হয়ে যায়। |
মার্চ মাসের মাঝামাঝি সময়ে কেরালা, তামিলনাড়ু এবং কর্ণাটকে বয়ে যাওয়া বিধ্বংসী শিলাবৃষ্টি কেবল জনজীবনই বিপর্যস্ত করেনি, বরং এই অঞ্চলের কয়েক হাজার কৃষকের স্বপ্নও ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছে। সাধারণত গ্রীষ্মের শুরুতে দক্ষিণ ভারতে হালকা বৃষ্টির দেখা মিললেও, এবারের এই তীব্র শিলাবৃষ্টি ছিল সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত।
প্রধান ক্ষতিগ্রস্ত ফসলসমূহ
শিলাবৃষ্টির সময় বরফের বড় বড় পিণ্ড এবং ঝোড়ো হাওয়ার কারণে বিভিন্ন অর্থকরী ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে:
কেরালা (ওয়ায়ানাদ): এখানকার প্রধান অর্থকরী ফসল কফি, গোলমরিচ এবং কলা চাষে বড় ধাক্কা লেগেছে। অনেক জায়গায় কফি গাছ থেকে অপরিণত কফি বিন ঝরে পড়েছে এবং গোলমরিচের লতা ছিঁড়ে গেছে।
তামিলনাড়ু (কোয়েম্বাটোর ও অন্নুর): এখানকার কয়েকশ একর জমির পেঁয়াজ, টমেটো এবং ফুল চাষ পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। বিশেষ করে অন্নুর ও মেট্টুপালয়ামে সবজি চাষিরা সর্বস্বান্ত হয়েছেন।
কর্ণাটক (ধারওয়াড়): শিলাবৃষ্টির কারণে আম এবং দানাদার শস্যের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। আমের মুকুল ও ছোট আম ঝরে যাওয়ায় এ বছর ফলন অনেকাংশে কমে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
দীর্ঘস্থায়ী বরফের প্রভাব ও মাটির স্বাস্থ্য
সাধারণত শিলা দ্রুত গলে গেলেও এবার ৩৮ ঘণ্টা পর্যন্ত বরফ জমে থাকায় মাটির ওপর বিরূপ প্রভাব পড়েছে:
শিকড় পচন: দীর্ঘক্ষণ বরফ জমে থাকায় মাটির তাপমাত্রা হিমাঙ্কের নিচে নেমে গিয়েছিল, ফলে অনেক গাছের শিকড় পচে গেছে।
অক্সিজেনের অভাব: মাটির ওপর বরফের পুরু স্তর থাকায় বায়ু চলাচল (Aeration) বাধাগ্রস্ত হয়েছে, যা ফসলের জন্য ক্ষতিকর।
সঞ্চয় ক্ষমতা হ্রাস: অনেক স্থানে বরফ গলে যাওয়ার পর অতিরিক্ত পানি কাদার সৃষ্টি করেছে, যা নতুন করে চারা রোপণের কাজকে পিছিয়ে দিচ্ছে।


