নিজস্ব প্রতিনিধি, দুর্গাপুর: ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনের রণদামামা বাজার অনেক আগেই শিল্পশহর দুর্গাপুরের রাজনৈতিক সমীকরণ এক নাটকীয় মোড় নিয়েছে। বিশেষ করে ২৭৬-দুর্গাপুর পূর্ব আসনে সিপিআইএম-এর পক্ষ থেকে প্রবীণ সিআইটিইউ (CITU) নেতা সীমান্ত চট্টোপাধ্যায়কে প্রার্থী করায় অস্বস্তি বেড়েছে শাসকদল তৃণমূল ও প্রধান বিরোধী দল বিজেপি—উভয় শিবিরেই।
কেন আলোচনায় সীমান্ত চট্টোপাধ্যায়?
বিশ্লেষকদের মতে, এবারের লড়াইয়ে সীমান্তবাবু কেবল একজন প্রার্থী নন, তিনি একটি ‘ফ্যাক্টর’। এর পেছনে কাজ করছে বেশ কিছু শক্তিশালী কারণ:
১. শ্রমিক মহলে গভীর শিকড়: দুর্গাপুর স্টিল প্ল্যান্ট (DSP) এবং অ্যালয় স্টিল প্ল্যান্টের (ASP) শ্রমিক কলোনিগুলোতে সীমান্ত চট্টোপাধ্যায়ের জনপ্রিয়তা প্রশ্নাতীত। সিআইটিইউ-এর রাজ্যস্তরের নেতা হওয়ার পাশাপাশি তিনি স্থানীয় মানুষের কাছে ‘ঘরের ছেলে’ হিসেবে পরিচিত। গত কয়েক বছরে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা বেসরকারীকরণের আশঙ্কার বিরুদ্ধে তাঁর আপসহীন লড়াই শ্রমিক পরিবারগুলোর ভোটব্যাঙ্ককে নতুন করে লাল ঝাণ্ডার দিকে টানতে শুরু করেছে।
২. তৃণমূলের অন্দরে ‘কাঁটা’:
বর্তমান বিধায়ক প্রদীপ মজুমদারের বিরুদ্ধে দলের অন্দরেই ক্ষোভ দানা বেঁধেছে। গোষ্ঠীকোন্দল এবং স্থানীয় স্তরে নেতৃত্বের সঙ্গে দূরত্ব তৃণমূলের বড় দুশ্চিন্তা। এই সুযোগে তৃণমূলের বিক্ষুব্ধ ভোট এবং সাধারণ মানুষের প্রতিষ্ঠানবিরোধী (Anti-incumbency) মনোভাবের ফসল ঘরে তুলতে মরিয়া বামেরা।
৩. বিজেপির হিন্দুত্ব বনাম বামেদের রুটি-রুজি:
২০২১ এবং ২০২৪-এর নির্বাচনে বিজেপি এখানে ভালো ফল করলেও, এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। বিজেপি প্রার্থী চন্দ্রশেখর বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়ে দলের আদি কর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে। অন্যদিকে, সীমান্তবাবু ধর্মীয় মেরুকরণের বদলে সরাসরি ‘রুটি-রুজি’, ‘শিল্পায়ন’ এবং ‘পৌর পরিষেবা’র মতো বিষয়গুলোকে সামনে আনায় মধ্যবিত্ত ভোটারদের একাংশও এবার বামেদের দিকে ঝুঁকতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
পরিসংখ্যান কী বলছে?
২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচনের নিরিখে এই আসনে তৃণমূল এবং বিজেপির ব্যবধান ছিল অতি সামান্য (প্রায় ০.৮%)। বামেদের প্রাপ্ত ভোট ছিল ১২.৩%। রাজনৈতিক মহলের ধারণা, সীমান্ত চট্টোপাধ্যায় যদি নিজের ব্যক্তিগত ক্যারিশমা এবং সিআইটিইউ-এর সংগঠনকে কাজে লাগিয়ে এই ভোট শেয়ারকে ২৫% থেকে ৩০%-এ নিয়ে যেতে পারেন, তবে দুর্গাপুর পূর্বে ‘জায়ান্ট কিলার’ হিসেবে তাঁর জয় নিশ্চিত হতে পারে।
বিশ্লেষণাত্মক ছক: দুর্গাপুর পূর্বের ত্রিভুজ লড়াই
| ফ্যাক্টর | তৃণমূল (প্রদীপ মজুমদার) | বিজেপি (চন্দ্রশেখর বন্দ্যোপাধ্যায়) | সিপিআইএম (সীমান্ত চট্টোপাধ্যায়) |
| শক্তি | সরকারি প্রকল্প ও সংগঠন | হিন্দুত্ববাদী ভোট ও মোদী ম্যাজিক | সিআইটিইউ-এর মজবুত শ্রমিক ভিত্তি |
| দুর্বলতা | গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব ও দুর্নীতি ইস্যু | আদি বনাম নব্য বিবাদ | আর্থিক সংস্থান ও মিডিয়া প্রচারের অভাব |
| এক্স-ফ্যাক্টর | উন্নয়নের খতিয়ান | মেরুকরণ | ব্যক্তিগত স্বচ্ছ ভাবমূর্তি ও ‘লোকাল’ কার্ড |
সব মিলিয়ে দুর্গাপুর পূর্বের লড়াই এবার আর কেবল ‘দুই ফুলের’ মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। সীমান্ত চট্টোপাধ্যায়ের ‘ভূমিপুত্র’ ইমেজ এবং বামেদের সংগঠিত প্রচার এবার দুর্গাপুরের শিল্পাঞ্চলে বড়সড় রাজনৈতিক ভূমিকম্প ঘটাতে পারে কি না, সেটাই এখন দেখার।


